৫ জুলাই ২০২৬ , রবিবার, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩, ১৯ মহর্‌রম ১৪৪৮।
৫ জুলাই ২০২৬ , রবিবার, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩, ১৯ মহর্‌রম ১৪৪৮।

ঢাকা পাবে কেমন মেয়র?

মীযানুল করীম

73125_f1গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি টিভি চ্যানেলে ঢাকার মেয়রপ্রার্থীদের নিয়ে ‘লাইভ’ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছিল। এতে উত্তর সিটি করপোরেশনে ক্ষমতাসীন জোটের সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হক সম্পর্কে জানানো হয়, তার প্রায় ২২ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। ঋণ রয়েছে ১৫১ কোটি টাকার। বাড়িভাড়া পান দুই লাখ টাকা। ব্যবসার আয় ২৫ লাখ টাকা। এর সাথে জানানো হয়েছে, তার ‘বার্ষিক আয়’ ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। হাতে নগদ আছে এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এবার সিটি নির্বাচনে নেমে নিজের পকেট থেকে খরচ করছেন ৫০ লাখ টাকা। তার কর্মী নাকি মাত্র ১৪৩ জন যাদের জন্য দিনে ২০০ টাকা করে ছয় লাখ টাকা খরচ হচ্ছে মোট। তিন লাখ পোস্টার ছাপিয়েছেন তিন লাখ টাকায়।
এত গেল আনিসুল হকের নিজের বক্তব্য। বাস্তবে আমরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যে সাড়ম্বর প্রচার-প্রপাগান্ডা এবং দলীয় তোড়জোড় দেখছি, তাতে আনিসের নির্বাচনী খরচের বহর যে কয়েক গুণ বেশি, সন্দেহ নেই। অবশ্য সে ব্যাপারে তিনি সহজেই বলতে পারেন, ‘এসব তো আমি করছি না। অন্যরা তাদের খরচে যা করার করছে।’ অতএব, নির্বাচন কমিশনের কী করার আছে।
সবাই দেখছেন, আওয়ামী লীগ বিরোধীদলীয় নির্বাচনী তৎপরতায় বাধা দেয়ার সব চেষ্টাই করছে সুকৌশলে। এ জন্য নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পুরনো নোসখার সাথে খোদ শীর্ষ নেত্রীর গাড়িতে হামলার নতুন দাওয়াই প্রয়োগ করা হয়েছে। আর প্রকাশ্যে যে কৌশল বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, তা হলো- আওয়ামী ঐতিহ্যমাফিক প্রচারণার বন্যা। দলের বিরাট নেটওয়ার্ক, কর্মীবাহিনী, কালচারাল ব্রিগেড, মিডিয়া সহায়তা প্রভৃতির সাথে যোগ হয়েছে, ক্ষমতায় থাকার সবিশেষ সুবিধা। আনিসুল হকের প্রচারণাই সবার আগে শুরু হয়েছিল। তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নির্বাচনে নামার পর আওয়ামী লীগ সমর্থন দিয়েছে- এমনটা মনে করার কারণ নেই। ঢাকা সিটি নির্বাচন নিয়ে এ দলের সিরিয়াস ভাবনাচিন্তা অনেক আগে থেকেই। আনিসুল হককে তারা টার্গেট করেই পরিকল্পনা নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে বরাবর সর্বাত্মক দলীয়করণ প্রকটভাবে ধরা পড়ে। আর সেই দল নিজের বলয়ের বাইরের একজন ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ’ ব্যক্তিকে রাজধানীতে মেয়রপ্রার্থী করবে দলীয় নেতাদের বাদ দিয়ে- এটা জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। অন্তত যারা ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ’ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ঘোর বিরোধী, তাদের কাছে সব ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে দলীয় স্বার্থ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আনিসুল হকের পরিচয় হিসেবে ‘তিনি আওয়ামী লীগ সদস্য নন’ বলার পরও মানুষের ধারণা বদলাবে না। এ দলের লোকেরা যেমন বিশ্বাস করেন, তেমনি প্রতিপক্ষেরও বিশ্বাস- তিনি এখন আওয়ামী লীগের অতি আপনজন। দলীয় স্বার্থ পূরণ হবে বলেই তার ওপর দলটি ভরসা করতে পেরেছে। জিতলে তার পক্ষে নিরপেক্ষ বা নির্দলীয় থাকা অসম্ভব হবে বলে মনে করাই স্বাভাবিক। কেননা, এ যাবৎ বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় চরিত্রের পরিপন্থী। তদুপরি, ক্ষমতাসীন দলের টেন্ডারবাজিসহ নানা কার্যকলাপের রেকর্ডের ভিত্তিতে আঁচ করা যায়, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জিতলে সিটি করপোরেশনের কী হাল দাঁড়াবে। যদি উত্তরে আনিসুল হক আর দক্ষিণে সাঈদ খোকন জয়ী হন এবং তাদের ওয়াদা মাফিক সিটি করপোরেশন দলের প্রভাবমুক্ত রাখতে পারেন, তা হবে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয়। বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রামের মেয়র মনজুর আলম তার আমলে সিটি করপোরেশনকে দলবাজি থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছেন। বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগার হলে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত নিজের শত ইচ্ছা সত্ত্বেও। ঢাকার নির্বাচনেও সচেতন ভোটাররা নিশ্চয়ই এটা মনে রেখেই রায় দেবেন।
আনিসুল হক সুবক্তা। টিভি প্রোগ্রাম উপস্থাপনার সুবাদে এক সময়ে সুপরিচিত ছিলেন। পরে ‘গার্মেন্ট শিল্পপতি’ পরিচয় মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আওয়ামী শিবির নন, বরং প্রতিপক্ষ মহলের ঘনিষ্ঠ বলেই এত দিন অনেকের ধারণা ছিল। কারণ, এফবিসিসিআইয়ের বিগত নির্বাচনে তিনি গোপালগঞ্জের লোক, প্রধানমন্ত্রীর কাছের মানুষ এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন সভাপতি পদে। এই আমলে যা হওয়ার, তা-ই হয়েছিল। নানা কায়দা কৌশলে আনিসের পরাজয় করা হলো নিশ্চিত। এবার তেমন কৌশলে আনিসকে জয়ী করে সে ‘ক্ষতি’ পূরণ করে দেয়ার চিন্তা কারো কারো মাথায় থাকতে পারে। অবশ্য সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল নিয়ে কোনো মহলের আপত্তি থাকবে না।
আনিসুল হকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যে, নবাগত তরুণ তাবিথ আউয়াল, এতে সন্দেহ নেই। মূলত প্রার্থী হয়েছিলেন তার বাবা আবদুল আউয়াল মিন্টু। যার পরিচয় দেয়ার তেমন দরকার হয় না। তাবিথ উচ্চশিক্ষিত হলেও বিনয়ী। বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কিংবা বিত্তবান পরিবারের সন্তান হওয়ার অহঙ্কার তার মধ্যে দেখা যায় না। ফুটবল খেলোয়াড় তাবিথ আউয়াল নির্বাচনের খেলায়ও ভালো করবেন বলে বিরোধী জোটসহ ভোটারদের বিরাট অংশের প্রত্যাশা।
ইত্তেফাক ২২ এপ্রিল প্রথম পৃষ্ঠায় একটি খবর ছাপিয়েছে। শিরোনাম : আনিসুলের প্রেমে পড়েছিলেন তসলিমা ও তার বোন। আগের দিন ফেসবুক স্ট্যাটাসে ভারত প্রবাসী বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন লিখেছেন, ‘(আনিসুল হক) টেলিভিশনে রাতের দিকে কী একটা অনুষ্ঠান করতেন। ওঁর চোখ, ওঁর হাসি, ওঁর কণ্ঠস্বর আমাকে সত্যি সত্যি পাগল করত। প্রতি রাতে ওঁর প্রেমে পড়তাম। আমার প্রেম দেখে আমার ছোট বোনও ওঁর প্রেমে পড়ে বসল। প্রেম জিনিসটা সত্যিই সংক্রামক।’ তসলিমার বক্তব্য মোতাবেক, আনিসের প্রেমে পড়ে দুই বোনের মধ্যে মুখ দেখাদেখি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আর আনিস তসলিমার বোনকে প্রেমপত্র দিলেও, তা তসলিমার হাতে পড়েছিল।
‘প্রেম’ কথাটার বৃহত্তর অর্থ হলো, প্রীতি ও ভালোবাসা। আনিসুল হক হয়তো আরো অনেক তরুণীর প্রেমের পাত্র ছিলেন অঘোষিতভাবে। কিন্তু তিনি জিতলে কি নগরীর লাখ লাখ বাসিন্দার প্রেমপ্রীতি অর্জন করার মতো নিরপেক্ষতা, সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন?
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে লড়াইটা একজন সাবেক মেয়রের সাথে আরেকজন সাবেক মেয়রপুত্রের। মির্জা আব্বাস ২০ দল সমর্থিত প্রার্থী হলেও মামলার তোড়ে তিনি আত্মগোপনে। নব্বইর দশকে ছিলেন মেয়র। স্ত্রী আফরোজা তার হয়ে সর্বাত্মক প্রচার চালিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অপর দিকে, আওয়ামী লীগ সমর্থন দিয়েছে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে মোহাম্মদ সাঈদ ওরফে খোকনকে। হানিফ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রিয়জন, তার পুত্র বঙ্গবন্ধুকন্যার অত্যন্ত আস্থাভাজন। হানিফ এরশাদ আমলের প্রথম দিকে তার দলে গিয়েছিলেন। তবে বেরিয়ে আসেন কিছুদিন পরে। তেমনি, ছেলে সাঈদ খোকন ‘১/১১’-এর পরে ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট দল গড়ায় শামিল হয়ে কিছুদিন পর ক্ষান্ত দেন। নেত্রীর আশীর্বাদ থাকায় দলে তার অবস্থান দুর্বল হয়নি। পুরন ঢাকার নাজিরাবাজারের খোকন মাজেদ সর্দারের নাতি। এই প্রভাবশালী সর্দার ছিলেন আগে মুসলিম লীগ এবং পরে বিএনপি মহলের লোক। খোকন যেখানে মহানগরীর রাজনীতিতেও নেতা হিসেবে আজো পরিচয় অর্জন করেননি (যদিও দলের একটা পদে আছেন), সেখানে মির্জা আব্বাস জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা। বিএনপির মহানগর আহ্বায়ক আব্বাসের পরিবার ঢাকার বাসিন্দা বহু আগে থেকেই। মুক্তিযোদ্ধা মির্জা আব্বাসের রাজনৈতিক জীবন সংগ্রাম-আন্দোলনের অভিজ্ঞতাপূর্ণ। সরকারি দমননীতির করাল গ্রাসে পতিত হয়ে তিনি নির্বাচনের প্রাক্কালেও জামিন পাননি। অব্যাহত বাধা ডিঙিয়ে তার পক্ষে স্ত্রীর অকান্ত প্রচারণা সবার নজর কেড়েছে।
ভোটারদের যা প্রত্যাশা
একটি টিভি চ্যানেলে ঢাকার মেয়রপ্রার্থীদের যৌথ সাক্ষাৎকার, অর্থাৎ মতামত প্রদান অনুষ্ঠানে দর্শকেরা তাদের প্রত্যাশা ও পছন্দ এই প্রার্থীদের জানিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন। এসব মত সাথে সাথে টিভিতে প্রচারিত হয়েছে অনুষ্ঠানটি চলার সময়ে।
এখানে ঢাকাবাসীর দাবি ও চাহিদাসূচক প্রশ্ন ও অভিমতগুলো তুলে ধরছি। ১) বর্ষায় বের হলেই হাঁটুপানি। ময়লার দুর্গন্ধে হাঁটা যায় না। জলাবদ্ধতামুক্ত এবং পরিচ্ছন্ন ঢাকা চাই। ২) যানজট থেকে মুক্ত নগরী উপহার দিন। ৩) ফুটপাথের হকারদের পুনর্বাসন করতে হবে। ৪) বছর বছর বাস ভাড়াবাড়ছে। এ নিয়ে কী ভাবছেন? ৫) আমরা চাই দলীয় প্রভাবমুক্ত মেয়র। ৬) কথা কম বলুন। কাজ করে দেখান। ৭) কথা দিয়ে কথা রাখেন, এমন মেয়রই চাই। ৮) যিনি নিরাপত্তা দিতে পারবেন নগরবাসীকে, তাকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই। ৯) সন্ত্রাস ও দূষণমুক্ত ঢাকা দেখতে চাই। ১০) যানবাহনের অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে। ১১) নির্বাচিত হলে তরুণদের জন্য ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ফ্রি দেবেন কি না। ১২) সৎ, তরুণ ও নির্ভীক ব্যক্তিকে দেখতে চাই মেয়র হিসেবে। ১৩) কোনো চাটুকার যেন নির্বাচিত হতে না পারে। ১৪) মেয়রকে হতে হবে দক্ষ ও নীতিবান। ১৫) খুন, ছিনতাই, হত্যা বন্ধ করতে হবে। ১৬) সন্ত্রাস ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাজধানী চাই। ১৭) ভূমিদস্যুদের কবল থেকে দখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধার করতে হবে। ১৮) আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করুন। ১৯) নির্বাচিত হলে ঘোষিত ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন করবেন? নির্বাচিত না হলে তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কি? ২০) এখন আপনারা যেভাবে মানুষের কাছে ছুটে যাচ্ছেন, নির্বাচনের পর সেভাবে যাবেন কি?
একজন মত প্রকাশ করলেন, প্রার্থীদের অঙ্গীকারগুলো অবাস্তব মনে হয়। আরেকজনের কথা, ভোটের সময় অনেক কথা বলেন প্রার্থীরা। কিন্তু ভোটের পরে তাদের পাত্তা মেলে না। অন্য এক ভোটার বললেন, নির্বাচনী ওয়াদাগুলো পূরণ করা হলে ঢাকার চেহারা বদলে সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে। নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পক্ষেও বলেছেন কোনো কোনো দর্শক।
আনিসুল হক ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত প্রার্থী। তাকে প্রশ্ন করা হয়, গার্মেন্ট মালিক হিসেবে অবৈধ বিজিএমইএ ভবন নিয়ে কী ভাবছেন? বনানী এলাকার আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য কী উদ্যোগ নেবেন?
যা হোক, আমরা সাধারণ ভোটারদের দাবি ও আকাক্সা মোতাবেক সৎ, যোগ্য, কর্মনিষ্ঠ, জনদরদি মেয়র পাবো কি না, সে জন্য নির্বাচনের ফল প্রকাশ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আমানতদারির দায়িত্ব ভোটারের
ভোট একটি পবিত্র আমানত। তাই এর সদ্ব্যবহার করা আপনার একটি গুরুদায়িত্ব।’ এ ধরনের কথা আজকাল ব্যবহৃত হয় ভোটারদের সচেতনতার জন্য। এই কথাগুলো প্রচার করা হয়, যাতে অপাত্রে মূল্যবান ভোট দিয়ে এর অপচয় করা না হয়। ‘পবিত্র’ ও ‘আমানত’ শব্দ দুটো যে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত, তা স্পষ্ট। বাংলাদেশের অন্তত শতকরা ৮৫ জনই মুসলমান। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন বা ভোটাভুটির তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা জানার আগ্রহ আছে অনেকেরই। এটা কিছুতেই মনে করা যায় না যে, ‘এসব ইলেকশন, ক্যাম্পেইন, ব্যালট নিছক ইহলৌকিক ব্যাপার-স্যাপার। তাই ধর্ম বা পরলোককে এসব ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ে টেনে আনার দরকারটা কী?’ আসলে এমন চিন্তাভাবনা করে অনেকেই নির্বাচনী কার্যক্রমে দুর্নীতি, অসততা, প্রতারণাসমেত নিজেদের যাবতীয় অন্যায় অপরাধকে বৈধতা দিতে চান। শুধু মুসলমান কেন, সব ধর্মাবলম্বীই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ইহজীবনের কর্মফল পরজীবনে ভোগ করতে হবে এবং সৎ কাজের পুরস্কার ও অসৎ কাজের শাস্তি- দুটোই স্রষ্টা এক দিন অবশ্যই দেবেন।
ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত, নাগরিকদের কাছে যা গচ্ছিত থাকে। কুরআনের সূরায়ে নিসায় আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতগুলো প্রাপকদের পৌঁছিয়ে দাও’ (আয়াত ৫৮)। সততা ও যোগ্যতার নিরিখে যিনি সর্বোত্তম, তাকে ভোট দেয়াই বিবেকের তাগিদ এবং ন্যায়নীতির দাবি। এর বিপরীতে, অসৎ দুর্নীতিবাজ সন্ত্রাসী দুশ্চরিত্র ব্যক্তিকে ভোট দিলে অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক সেই সর্বশক্তিমানের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
প্রার্থীদের মধ্যে উত্তম নন, বরং যার চরিত্র আচরণ জীবনধারা, উপার্জন প্রভৃতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে- এমন কাউকে আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতা, দলীয় দাসত্ব কিংবা ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা সম্পর্কের কারণে সমর্থন দিলে, তা হবে ভোটরূপী আমানতের খেয়ানত। একটি হাদিসে রয়েছে সাহাবারা রাসূলুল্লাহ সা:-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সা:, কিয়ামত কখন হবে? রাসূল সা: জবাব দিলেন, যখন খেয়ানত করা হবে আমানতের। সাহাবারা প্রশ্ন করলেন, আমানতের খেয়ানত হয় কিভাবে?’ রাসূল সা: জবাব দিলেন, যখন দায়িত্ব দেয়া হবে অযোগ্য লোককে; তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।’
ইসলামের দৃষ্টিতে সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করা ওয়াজিব। মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াকে আল কুরআনে হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোট হতে হবে সত্যের সাক্ষ্য। আর অর্থের বিনিময়ে অসৎ অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেয়া হলে দু’টি অপরাধ ঘটে যায়। একটি হলো, ঘুষ নেয়া। অন্যটি হচ্ছে, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। মুসলমানদের বিশ্বাস করতে হবে, এই দু’টি অপকর্মই কবিরা গুনাহ।
প্রসঙ্গক্রমে শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল। আমার জীবনে ভোটের প্রথম অভিজ্ঞতা সিটি করপোরেশনের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের। সেটাও শহরের ভোটাভুটি। আমাদের ওয়ার্ডে একজন খুব সৎ মানুষ প্রার্থী হলেন।’ প্রতিবেশী গরিব অশিক্ষিত বাসিন্দারা বলছিলেন, ‘উনি মানুষ ভালো, তবে তাকে ভোট দিলে তা পচে যাবে।’ আসলে প্রভাবশালী দু-একজন প্রার্থীর এমন প্রচারণা ও তোড়জোড় ছিল যে, সাধারণ মানুষের অনেকে ধরে নিলেন, সে দাপুটে প্রার্থীই জিতবেন। সৎ মানুষটা তো হেরেই যাবেন, ভোট দিয়ে লাভ কী?’ এভাবে দেখা যায়, ভোট যাতে পচে না যায়, সে জন্য পচা মানুষকেই জিতিয়ে আনা হয়। তাদের ফরমালিন দিয়ে তাজা হিসেবে দেখিয়ে ভোটারদের করা হয় প্রতারিত।
সেই ষাটের দশকের যে পৌরসভা নির্বাচনের কথা বলছিলাম, তখনকার আরেক ঘটনা। পাড়ার এক গরিব মহিলা এলেন আমার মায়ের কাছে। তিনি জানতে চাইলেন, মহিলাটি ভোট দিয়েছে কি না। ওই অশিক্ষিত মহিলা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘আপনারা তো শুধু ভোট দিয়েছেন। আমরা ভোট খেয়েছিও।’ শুনে আমার মা তো হতবাক! ওই মহিলা এবার বুঝিয়ে বললেন, ‘ভোট দিতে গেছি। সেখানে চা-পান খাইয়েছে আমাদের।’ এবার বোঝা গেল ‘ভোট খাওয়া’র অর্থ। অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ প্রার্থীরা এখনো নানা কায়দায় টাকা খরচ করেন। শুধু নাশতা বা যাতায়াত খরচ দেয়াই নয়, নগদ নারায়ণও হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। দুনিয়া অনেক বদলালেও আমাদের অনেকের স্বভাব বদলায়নি। তাই এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘চাঁদরাতের মাইর’ নিয়ে বহু এলাকায় সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা উদ্বিগ্ন। ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে।’ দুর্নীতি আর ভোট কেনার ওস্তাদরা যাতে সে সুযোগ না পায়, এ জন্য সবার সতর্কতা ও প্রতিরোধ জরুরি।
রাজনৈতিক নাবালকেরা সাবধান
২৮ এপ্রিল ঢাকা-চট্টগ্রামে কী হবে, তা জানতে বোধহয় কোনো গণকঠাকুরের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। নির্বাচনের পর কেউ বলবে ‘দারুণ’, কেউ বলবে ‘নিদারুণ।’ কেউ গাইবে, ‘এমন নির্বাচন কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি; কেউ বলবে, হাচাই (সত্যই)! কেন্দ্র দখল, সিলমারা আর বোমা মারার এমন নির্বাচন হাচাই কোথাও খুঁইজা পাওন যাইব না।’… আমরা রাজনৈতিকভাবে সাবালক হবো কবে? আমরা এখনো কি সেই ১৯৮৬ মডেলের নির্বাচনই করতে থাকব? ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের সিন্দাবাদের ভূত কি আমাদের কাঁধের ওপর থেকে নামবে না কোনো দিন? সরকারি কর্মচারীরাই বা আর কত দিন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী না হয়ে ব্যক্তি বা দলের কর্মচারী হয়ে থাকবেন?
১৯৮৬ সালে না হয় দেশে স্বৈরশাসন ছিল, এখন কী শাসন? তখন প্রশাসনকে ধমক দিয়ে ইচ্ছামতো নির্বাচনের ফল আদায় করা হয়েছে। সরকার আর নির্বাচন কমিশন বলতে গেলে সমার্থকই ছিল। আজ তিন দশক পরও কি একই তরিকা চলবে? আমাদের শরম-হায়া বলে কি কিছু নেই? সারা দুনিয়া এ ধরনের নির্বাচন দেখে যে, আমাদের দুয়ো দেয়, তা কি আমরা বুঝি না?’
কথাগুলো সাবেক সচিব, কলামিস্ট ও কবি মোফাজ্জল করিমের। ১৭ এপ্রিল দৈনিক কালের কণ্ঠের উপসম্পাদকীয় তিনি লিখেছেন, ‘সেই নির্বাচন (১৯৮৬), এই নির্বাচন (২০১৫)’ শিরোনামে। তার কলামের নাম ‘সেলাই খোলা মুখ।’
এখনো ফিট হলেও হিট নন
এরশাদের বয়স এখন ৮৫ বছর সার্টিফিকেট মোতাবেক। বাস্তবে এর কম নয়, দু-এক বছর বেশি বলে ধরে নিলে ভুল হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘এরশাদ’ কে, তার ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। একটি পত্রিকা গত শুক্রবার সাপ্তাহিক সাময়িকীতে তার বড় ছবি দিয়ে ফিচার ছাপিয়েছে। শিরোনাম ‘এখনো ফিট’। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পার্টির জনক এরশাদ যুবকের মতো মুগুর ভাজছেন ব্যায়ামাগারে। ফোলা বাহু দেখে কেউ বলবে না যে, তিনি অশীতিপর। এখনো দিনে ২ ঘণ্টা তার ব্যায়াম করা চাই।
পত্রিকাটিতে লেখা হয়েছে, ‘সুখী সুন্দর জীবনের জন্য শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। ইনিই ১৯৮২ সালে সংবিধান লঙ্ঘন করে, সেনাপ্রধান হিসেবে সদ্যনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে আমাদের জাতীয় জীবনে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার সূচনা করেছিলেন।
এরশাদ যে জীবনের আটটি দশক পেরিয়েও স্বাস্থ্য ধরে রেখেছেন- এটা প্রশংসনীয়। তবে বিভিন্ন সময়ে তার Political somersaulting বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের পরিপন্থী ভূমিকা রেখেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার ব্যাপার নয়।
এরশাদ দৈহিকভাবে ফিট হলেও রাজনৈতিকভাবে সব ক্ষেত্রে হিট করতে পারেননি। এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার দলের সে আশা পূরণ হবে না। তবুও দলীয় প্রার্থীর প্রচারণায় নেমেছিলেন তিনি। অথচ তিনি প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশেষ দূত’ হিসেবে সরকারি সুবিধাভোগী। তাই কোনো প্রার্থী প্রচারকাজে জড়িত হতে পারেন না। ইলেকশন কমিশন এ জন্য সতর্ক করে বুঝিয়ে দিয়েছে, এরশাদ শারীরিকভাবে ফিট হলেও ইলেকশন ক্যাম্পেইনের জন্য ফিট নন। তবে এরশাদও কম যান না। তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নিজের ক্যাম্পেইন জারি রেখে জানাতে চাইলেন, হিট না হলেও তিনি ফিট।

সংবাদটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on print
Print
Share on email
Email
Share on whatsapp
WhatsApp

কোন মন্তব্য নেই। আপনি প্রথম মন্তব্যটি করুন। on ঢাকা পাবে কেমন মেয়র?

আপনি কি ভাবছেন ? আপনার মতামত লিখুুন।

এই বিভগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ