মোহাম্মদ আতিকুর রহমান

রাজনীতি এমন এক মঞ্চ, যেখানে কালকের প্রতিপক্ষ আজকের সহযাত্রী হয়ে যায়। গতকাল যারা হুমায়ূন কবীরকে নিয়ে কটূক্তিতে ব্যস্ত ছিলেন, তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন—তারাই হয়তো আগামীকাল ফুল হাতে তাঁকে স্বাগত জানাবেন। এটাই রাজনীতির স্বভাব; এখানে স্থায়ী শত্রু নেই, নেই স্থায়ী বন্ধু, আছে কেবল স্বার্থ ও সময়ের সমীকরণ।
বিশেষ করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবীরকে দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দল থেকে ঘোষণা দেবার পরপরই এখন তাকে ঘিরে চারদিকে স্তুতি স্রোত বয়ে যাচ্ছে। তবে হুমায়ূন কবীরকেও এটা মনে রাখতে হবে—রাজনীতির মাঠ খুবই পিচ্ছিল। এখানে কখন কার পা স্লিপ করে, তা কেউ বলতে পারে না। জনপ্রিয়তা যেমন হঠাৎ বেড়ে যায়, ঠিক তেমনি একটি ভুল সিদ্ধান্তই পুরো চিত্র পাল্টে দিতে পারে।
বার্মিংহামে তার সঙ্গে একান্ত আলাপে বসে আমি অন্য এক হুমায়ূন কবীরকে চিনেছিলাম। যিনি কেবল দলীয় রাজনীতিক নন, বরং রাষ্ট্রচিন্তায় বিশ্বাসী একজন মানুষ। তার চোখেমুখে ছিল বাংলাদেশ নামের দেশটির প্রতি গভীর ভালোবাসা। কথায় কথায় উঠে আসছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শ, আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ত্যাগ, এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন।
তিনি রাজনীতিকে দেখেন ক্ষমতার খেলা হিসেবে নয়, বরং একটি দায়িত্ব হিসেবে—রাষ্ট্র গঠনের এক অবিরাম প্রক্রিয়া হিসেবে। তিনি সিলেট তথা পুরো বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে চান এক অনন্য উচ্চতায়।
বিএনপি’র পতিষ্টাতা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেমন দূরদর্শিতার সঙ্গে সিলেটের উন্নয়নের রূপকার এম সাইফুর রহমানকে সামনে এনেছিলেন, তেমনি আজকের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দূরদর্শী আবিষ্কার হিসেবে উঠে আসছেন হুমায়ূন কবীর।
এম সাইফুর রহমান ছিলেন সিলেটের গর্ব, যিনি শুধু অর্থনীতি নয়—রাষ্ট্রচিন্তার মানচিত্রে সিলেটকে স্থায়ী আসন দিয়েছিলেন। তার কর্মপদ্ধতি, সাহসী সিদ্ধান্ত ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়েছিল। তিনি সিলেটের উন্নয়নে ছিলেন অবিচল। ইস্পাত কঠিন ছিলো তার দৃঢ়তা। কোন রক্ত চক্ষুর কাছে তিনি মাথা নোয়াননি সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে। তাই সিলেটবাসী এখনো তাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। ভালোবেসে তার নামের আগে পরম মমতায় বসায় সিলেট বন্ধু বার সিলেট উন্নয়নের রূপকার হিসেবে।
হুমায়ূন কবীরের চিন্তায় সেই একই ধারা খুঁজে পাওয়া যায়। তার বক্তব্যে যেমন থাকে জাতীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা, তেমনি থাকে স্থানীয় উন্নয়নের বাস্তব পরিকল্পনা।
তাই আমিই প্রথম বলেছিলাম— “হুমায়ূন কবীরের মাঝে এম সাইফুর রহমানের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন অনেকে।” চ্যানেল এস-এ প্রচারিত সেই সংবাদ দেখে অনেকেই ফোন করে বলেছিলেন—“আপনি একদম ঠিক বলেছেন।” আজ সময় প্রমাণ করছে, সেই মন্তব্য নিছক রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল না; ছিল একটি বাস্তব ইঙ্গিত। আর তা আগামীতে সবার চোখের সামনে এসে হাজির হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো রাষ্ট্র মেরামত। এটি কোনো স্লোগান নয়; বরং একটি ভাবদর্শন। তিনি বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্র ঠিক করতে হলে দরকার চিন্তাশীল নেতৃত্ব—যে নেতা দলীয় সীমানা পেরিয়ে দেশের বাস্তবতাকে বুঝতে পারে।
হুমায়ূন কবীর সেই ভাবনারই এক জীবন্ত প্রতিফলন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নতুন প্রজন্মের এমন কিছু নেতাকে সামনে আনছে, যারা কেবল আবেগ নয়—দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসছেন।
ঠিক যেমন শহীদ জিয়া করেছিলেন, এম সাইফুর রহমানসহ যখন তিনি একের পর এক দক্ষ সংগঠক, বুদ্ধিজীবী ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন।
সিলেট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী এলাকা। প্রবাসীদের অর্থনৈতিক অবদান, ধর্মীয় অনুভূতি, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা—সব মিলিয়ে সিলেট সবসময় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এম সাইফুর রহমান সেই প্রেক্ষাপটে ছিলেন উন্নয়নের প্রতীক।
এখন প্রশ্ন—হুমায়ূন কবীর কি পারবেন সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে? তিনি কি পারবেন সিলেটের উন্নয়নকে আবারো জাতীয় অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসতে?
যদি বিএনপি আগামী নির্বাচনে সরকার গঠন করে, তাহলে হুমায়ূন কবীরের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চাইলে সিলেটের উন্নয়নকে নতুন উচ্চতায় নিতে পারেন—প্রবাসী বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা ও পর্যটনে নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারেন। তাই এখন থেকেই হুমায়ূন কবীরকে আরো সতর্কতার সাথে পথ চলতে হবে। মনে রাখতে হবে দলীয় কোন্দলে না জড়িয়ে সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসতে পারাটাই হবে মূল চ্যালেন্জ। তাকে মনে রাখতে হবে রাজনীতিতে সাফল্য কেবল প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়ায় না; দরকার ধৈর্য, কৌশল ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ।
হুমায়ূন কবীরকে এখন সেই পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে—তিনি কি পারবেন জনমানুষের আস্থা ধরে রাখতে? পারবেন কি সংগঠনের ভেতরের বিভাজনগুলো মেলাতে?
এইসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—তার মানসিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে এগিয়ে রাখবে। বিশেষ করে যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর তার সিলেট প্রত্যাবর্তন ছিলো ঐতিহাসিক। দলের নেতা কর্মীরা তাকে যেভাবে স্বাগত জানিয়েছেন তা যদি অব্যাহত থাকে তবে তার জন্য কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
পরিশেষে এটা বলতে পারি, রাজনীতি সময়ের খেলা হলেও, নেতৃত্ব ইতিহাসের মূল্যায়ন পায়। আজকের হুমায়ূন কবীর হয়তো এম সাইফুর রহমান নন, কিন্তু তিনি সেই পথের এক সম্ভাবনাময় যাত্রী। যদি তিনি আদর্শে অটল থাকেন, উন্নয়নে মনোযোগী হন এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রাখেন—তাহলে একদিন হয়তো ইতিহাসই বলবে, ‘সিলেট উন্নয়নে হুমায়ূন কবীর – সাইফুর রহমানের উত্তরসূরি।’ তাকে জানাই অভিনন্দন ও শুভকামনা—সিলেটের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় তার পদচারণা হোক দৃঢ়, চিন্তাশীল ও আলোকিত।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
বার্মিংহাম






কোন মন্তব্য নেই। আপনি প্রথম মন্তব্যটি করুন। on হুমায়ূন কবীর কি এম সাইফুর রহমানের ছায়া হতে পারবেন!