১২ ডিসেম্বর ২০২৫ , শুক্রবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৭।
১২ ডিসেম্বর ২০২৫ , শুক্রবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৭।

বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভিড়, ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ

আশরাফুল ওয়াহিদ দুলাল:

২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয়প্রত্যাশী আবেদন রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাসাইলাম এজেন্সি এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইইউ, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড মিলিয়ে মোট ৪৩,২৩৬টি প্রথমবারের শরণার্থী আবেদন জমা পড়ে বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে, যা আগের বছরের ৪০,৩৩২টি আবেদন থেকে প্রায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

এই আবেদনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৭৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৩,৪৫৫টি আবেদন জমা পড়ে ইতালিতে। এরপরে অবস্থান করছে ফ্রান্স (৬,৪২৯টি) এবং আয়ারল্যান্ড (~১,০০৬টি)। এটি স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইদানীং দক্ষিণ ইউরোপের উপকূলবর্তী দেশগুলোকেই প্রধান প্রবেশমুখ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ইতালির সিসিলি ও লাম্পেদুসা দ্বীপপুঞ্জের উপকূল হয়ে বহু বাংলাদেশি সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেন বলে দেশটির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়।

তবে এই বিপুল সংখ্যক আবেদন সত্ত্বেও, অনুমোদনের হার অত্যন্ত কম। ইইউর গড় স্বীকৃতি হার যেখানে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় ৯৬ শতাংশ বাংলাদেশি আবেদনকারীই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। ইউএএ এবং এপি নিউজের তথ্যমতে, বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘নিরাপদ দেশ’-এর তালিকায় থাকায় আশ্রয় চাওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না বলেই অধিকাংশ আবেদন নাকচ হয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইইউ প্লাস দেশগুলোতে প্রথমবারের আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সিরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে ছিল—প্রতিজনের ৩,৩০০টি করে আবেদন জমা পড়ে। ভেনেজুয়েলা (৮,৯০০) ও আফগানিস্তান (৭,৪০০) ছিল শীর্ষে। মার্চ মাসে ইইউর মোট আবেদন ছিল প্রায় ৬৭,০০০, যার ৪.৯ শতাংশই এসেছিল বাংলাদেশিদের কাছ থেকে।

তবে এই বাস্তবতা সত্ত্বেও আশ্রয়প্রত্যাশীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং উন্নত জীবনের প্রত্যাশা অনেককে ইউরোপমুখী করছে। যদিও ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে ইতালি ও আলবেনিয়ার মধ্যকার সামুদ্রিক অভিবাসন চুক্তির আওতায় উদ্ধার হওয়া প্রথম ১৬ জনের মধ্যে ১০ জনই ছিলেন বাংলাদেশি, যাদের জাহাজভিত্তিক কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে ২২টি দেশের নাগরিকদের জন্য ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চালু করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থায় তিন মাসের মধ্যে আবেদনকারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে এবং প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে দ্রুত ফেরত পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আশঙ্কা রয়েছে যে, দ্রুত প্রক্রিয়াকরণে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে বিবেচনা না করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। তবে তা নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক পথে পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইউরোপীয় দেশগুলোও অভিবাসন নীতিতে মানবিক দিক বিবেচনায় পুনর্বিন্যাসের আহ্বান জানাচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষ শ্রমিক রপ্তানি ও অভিবাসন সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করার তাগিদ রয়েছে।

এই মুহূর্তে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইইউর অভিবাসন নীতির পরিবর্তন, দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আইনানুগ অভিবাসন চ্যানেল কতটা কার্যকরভাবে তৈরি করা যায়, তার ওপর। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশিদের অধিকাংশই শরণার্থী মর্যাদা না পেয়ে আশ্রয় হারাচ্ছেন, এবং আইনি জটিলতায় পড়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন।

সংবাদটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on print
Print
Share on email
Email
Share on whatsapp
WhatsApp

কোন মন্তব্য নেই। আপনি প্রথম মন্তব্যটি করুন। on বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভিড়, ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ

আপনি কি ভাবছেন ? আপনার মতামত লিখুুন।

এই বিভগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ