২৫ জুন ২০২৬ , বৃহস্পতিবার, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩, ৯ মহর্‌রম ১৪৪৮।
২৫ জুন ২০২৬ , বৃহস্পতিবার, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩, ৯ মহর্‌রম ১৪৪৮।

দু’টি অনুগল্প ও একজন এরশাদ

মাসুদ মজুমদার

17_1ক. গল্পটা উদ্ভট ও পুরনো। গ্রামের মসজিদ, তার লাগোয়া ঘন বনজঙ্গল। মসজিদের চার পাশের বাঁশের বেড়াও আধাভাঙা। জঙ্গলের ভেতর এক তরুণ ও তরুণী অসামাজিক কাজে মগ্ন। মসজিদে ইবাদত-বন্দেগি করছিলেন একজন সাধারণ মুসল্লি। মুসল্লি একসময় আনমনে পশ্চিম দিকে ভাঙা বেড়া গলিয়ে থুতু ফেললেন। ওই থুতু গিয়ে পড়ল অসামাজিক কাজে মগ্ন কামিনীকাতর রমণী-বল্লভ তরুণের গায়ে। তরুণ দাঁড়িয়ে গেল, ক্ষিপ্তকণ্ঠে মুসল্লিকে ধমকের সুরে বলল- মসজিদে বসে ইবাদত করেন, জানেন না পশ্চিম দিকে থুতু ফেলা মাকরুহ (অপছন্দনীয় কাজ)। মুসল্লি আমতা আমতা করে কৈফিয়তের সুরে বললেন- বাবা, পশ্চিম দিকে থুতু ফেলা আমার ঠিক হয়নি। তবে তুমি যে কবিরা গুনাহের মতো মহাপাপ করছ, এটা কি ঠিক হচ্ছে? যুবকের সাফ জবাব- তাতে আপনার কী? আমরা কোনো সামাজিকতা ও রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না। তাবৎ বিশ্ব এসে চাপ দিলেও মাথা নত করব না, এই অপকর্ম থেকে বিরত হবো না। বটে! মুসল্লির কথা বলাও তো বড় মাপের পাপই হলো। দেখে ফেলাতো রীতিমতো অন্যায় হয়েছে।

তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের পাপটা বড়ই বলতে হবে। কারণ, তারা জালজালিয়াতি, সীমাহীন বাড়াবাড়ি ও ঔদ্ধত্য দেখতে গেল কেন। দেখার সাক্ষী হতেই বা গেল কেন। সহস্র নাগরিক, অজস্র পেটোয়া বাহিনী এবং লাখো হারামখোর সুবিধাবাদী- কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর ‘পাপটা’ দেখা তো সত্যিই অপরাধ। আমার কাছে এই গল্পের কোনো উপসংহার নেই। তিন সিটির বঞ্চিত ভোটারদের পদতলে আমার উদ্ভট গল্পটি উৎসর্গ করলাম। এতে তাদের ক্ষোভ-দুঃখ প্রশমন হবে কি না জানি না। আমাদের প্রতিবাদ না করার পাপটা তো সামান্য হলেও স্খলন হবে।
খ. দ্বিতীয় গল্পটিও সবার জানা। চোরের ছেলে- তার বাপকে মানুষ চোর বলে, তাকে বলে চোরের বেটা; তা হজম করা তার জন্য কঠিন হতো। সে মনে মনে জেদ ধরল, যদি কোনো দিন সুযোগ হাতে এসে যায়, তখন সে  ডাকাত হয়ে বেটাদের তার বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে। তাদের মুখ দিয়ে বলতে বাধ্য হবে তার বাপ তারচেয়ে ভালো। প্রয়োজনে চোরের বেটা মরে গিয়েও তাদের শান্তিতে থাকতে না দেয়ার ব্যবস্থা করে যাবে। প্রতিশোধ তো নেবেই, অধিকন্তু হয়রানির জ্বালা কাকে বলে তা জানিয়ে ছাড়বে। একসময় গণমানুষের গণপিটুনি খেয়ে চোর বেটা অক্কা পেল। রেখে যাওয়া সন্তান হলো চোরের বেটা ডাকাত। সে শুধু চুরি করে না, ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যাকে পায় তাকে খুন-জখম করে দেয়।
একসময় সেও ধরা পড়ল। গণপিটুনিতে কাবু হয়ে মরে মরে অবস্থায় গ্রামবাসীর কাছে শেষ মিনতির সুরে আবদার করল- আমি তো মরেই যাচ্ছি, আমার একটা অনুরোধ, বলতে পারেন শেষ ইচ্ছা, আমার পাপের শেষ নেই। এত পাপের প্রায়শ্চিত্তও এক জনমে সম্ভব না। এই পিটুনিতে মরে গেলেও আমাকে পুলিশে দেবেন না। পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আমার পাছায় বাঁশ ঢুকিয়ে চার রাস্তার মোড়টার মাঝখানে বাঁশটি পুঁতে রাখবেন। গ্রামবাসী তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করল। লাশের প্রতি অসম্মান ও আইন হাতে তুলে নেয়ার দায়ে গ্রামের ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ সবাইকে ধরে নিয়ে থানার লকআপে ঢুকানো হলো। সবাই বসে বিলাপ করে কাঁদছে আর বলছে- চোরের বেটা ডাকাত আমাদের মরেও জ্বালিয়ে ছাড়ল। তার বাপ ঢের ভালো ছিল। চুরি করত, ঘর জ্বালাত না; পালিয়ে বাঁচতে খুন-জখম করত না।
দুটো গল্পই আমার আজকের কলামের বিষয়বস্তু। এর ভেতর আমাদের জন্য সবক থাকলে ভালো; না থাকলে ক্ষমা চাইতে এই অধমের কোনো লজ্জা নেই। ক্ষমতার চৌহদ্দিতে এত পাপ! এখন লজ্জাও লজ্জা পাচ্ছে।
গ. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আনপ্রেডিক্টেবল ক্যারেক্টার। আজ যে থুতু তিনি ছিটিয়ে ফেলেন, কাল সেটাই চেটে খান। নিজের দলটাকে নিজেদের মতো ভাড়াটে দলে পরিণত করেছেন। নিজের প্রথমাকেও সরকারি দলে ভাড়া খাটাচ্ছেন। নাম দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। যে সংসদ নির্বাচন দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, তার আবার বিরোধী দল কী? তারপরও যে সংসদের পুরো কর্মঘণ্টা খালেদা জিয়া ও ২০ দলীয় জোটকে প্রতিপক্ষে রেখে তুলোধুনো হয়, সেই সংসদে রওশনের বসে বসে বদকথা হজম করার জন্য বসে থাকতে হয় কোন গণতন্ত্র ও জাতি উদ্ধারের জন্য। তাদের রাজনৈতিক লজ্জা কখনো ছিল না। এখনো নেই। যা বলেন তা করেন না। যা করেন তা বলেন না। এরশাদের এই দ্বৈত ও দুর্বোধ্য চরিত্রের স্বরূপটা প্রথম ধরেছিলেন শিল্পী ও পটুয়া খ্যাত কামরুল হাসান। ‘বিশ্ববেহায়া’ শিরোনামে এরশাদের কার্টুনটি তার ক্ষমতাচর্চার সময় ব্যাপক আলোচিত ছিল। এ দেশে তিনটি রাজনৈতিক কার্টুন যুগ যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ওপর করা স্কেচ, ’৭১ সালে ইয়াহিয়ার ব্যঙ্গচিত্র ‘জানোয়ার’ এবং এরশাদের ওপর ‘বিশ্ববেহায়া’ কার্টুনটি। এরশাদের রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির এক অংশ হাইজ্যাক করে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও সেই দল থেকে ভাড়াটে মন্ত্রী।
জাপা জাতীয়তাবাদী ধারায় রাজনীতি করলে উৎরে যেত। ভারতীয় চাপের কাছে নতি শিকারের আগের কথায় থাকলে এখন তিনি হতেন নমস্য। নমস্যরা হতেন রাজনীতির জঞ্জাল। এখন জাতীয় পার্টি আমাদের গণতন্ত্রের জন্য একটি মন্দ উপমা, যার জন্মটাই যেন আজন্ম পাপ। রুচিহীন রাজনীতির দৃষ্টান্ত বর্তমান সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণায় একটি দল কিভাবে ভাড়াটে হয়ে গণতন্ত্রের চরিত্র ও বস্ত্র হরণ করে তার নজির টানার জন্য গণতন্ত্র চর্চার গবেষণাগারে এই দলটি বারবার আলোচিত হবে। এরশাদ চরিত্রও গবেষণার বিষয় হবে। এর আগেও অনুগত বিরোধী দলের ধারণা আমরা পেয়েছিলাম। এরশাদই সেটি জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন। একটি দল সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অবস্থানে হয়েও মন্ত্রী পরিষদে এমনকি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার অবস্থানে কিভাবে থাকতে পারে, তা জানার জন্য সরকারকে জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই। জাতীয় পার্টিকে জিজ্ঞাসা করেও কাজ নেই। যদি জিজ্ঞাসা করতেই হয় তাহলে বড় মাপের গণতন্ত্রের দাবিদার সুজাতা সিংদের ভারতীয় কূটচালের কূটনীতিবিদদের জিজ্ঞাসা করাই ভালো। তাদের প্রযোজিত, পরিচালিত নাটকে সরকারের ডান, বাম ও কোলবালিশতুল্য ক্ষমতার পার্টনাররা অভিনয় করে যাচ্ছেন।
এত কথা উঠত না, যদি না সম্প্রতি এরশাদ আবার তার দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের আহ্বান না জানাতেন। গোলাম কাদের এক দিন আগে বললেন, সরকারের সব অপকর্মের দায় জাতীয় পার্টিরও। তারপরই ‘বড়ভাই’ মন্ত্রীদের আদুরে ভাষায় সংসদীয় গণতন্ত্রের সবক দিলেন।
একটি নির্বাচিত সরকারকে বন্দুকের মুখে উপড়ে ফেলে এরশাদের ক্ষমতা দখল ছিল ষোলোআনা অনৈতিক, অবৈধ ও অসাংবিধানিক। যে মাত্রায় অনৈতিক এরশাদ, তারচেয়ে কম মাত্রায় ৫ জানুয়ারির নির্বাচনহীন পরিস্থিতির গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া সরকার- নীতিভ্রষ্ট ও অনৈতিক নয় তা কোন যুক্তিতে বলা হবে। এরশাদ বারকয়েক বলেছেন, তিনি যদি স্বৈরাচার হন তাহলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচারের জননী। তিনি নূর হোসেন-মিলন-বসুুনিয়াসহ অল্প ক’জন মানুষ হত্যার দায় বহন করছেন। এখন পাখির মতো মানুষকে গুলির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে শত শত মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘতর হচ্ছে। গুম-অপহরণের মহামারী শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়ন এখন মাত্রাহীন। কারাগারে ঠাঁই নেই। সেখানে মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারাগার থেকে বিনা চিকিৎসায় রাজনীতিবিদ লাশ হয়ে বেরুচ্ছেন। নাসিরউদ্দীন আহম্মেদ পিন্টুর মৃত্যু নিয়ে অসংখ্য গুজব এবং কানকথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি হলো না, হলো যারা অভিযুক্ত তাদের সমগোত্রীয়দের দিয়ে। হালে বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু যুবক অপহৃত হচ্ছে। পরে তাদের গাড়িচাপায় মৃত্যুর খবর দেয়া হচ্ছে। এটা কি ক্রসফায়ারের নতুন গল্প!
সমস্যা হচ্ছে এরশাদ নিজে স্বৈরাচার হয়ে দায় নিতে বাধ্য, আবার তার ভাষায় তারচেয়েও বড় স্বৈরশাসকের শাসন-শোষণের দায় নিতেও বাধ্য। এ অবস্থায় দাঁড়িয়েও এরশাদ ভাবেন, বিএনপি নির্মূল হবে। জাতীয় পার্টি নতুন করে জাগবে। জাতীয় পার্টির সুদিন আসবে। জাতীয়তাবাদী ধারার কাণ্ডারি হয়ে তিনি শনৈঃশনৈ এগিয়ে যাবেন- এমন স্বপ্ন দেখতে দোষ কী! স্বপ্নে খেলে পান্তা কেন, বিরিয়ানি খাওয়াইতো উত্তম।
এরশাদ আমলে সাদা পোশাকে কালো শাসন প্রত্যক্ষ করেছি। এখন গণতন্ত্রের নেকাব পরা রাজনৈতিক দৈত্যের শাসন দেখছি। একটি গণনন্দিত জাতীয় সাপ্তাহিক পরিচালনা করতে গিয়ে সেসময় বারকয়েক মামলার মুখোমুখি হয়েছি। সচিবালয়ে হাজিরা দিয়েছি। মানতেই হবে এরশাদ ছিলেন সংবেদনশীল কিন্তু খলচরিত্রের স্বৈরাচার। বর্তমানে জাতির ওপর চেপে বসেছে নিষ্ঠুর এবং ছদ্মবেশী স্বৈরাচার। সে তুলনায় এরশাদ মন্দের ভালো। এই বয়সে একটু নীতিনিষ্ঠ হয়ে হায়া শরম গায়ে মাখালে তারই তো লাভ। নীতি-নৈতিকতাকে এভাবে জঞ্জাল ভেবে যারা দুমড়েমুচড়ে শাসন-শোষণ চালায়, তারা পরিণতি ভুলে যায়। ভুলে যাওয়ার সদর রাস্তা দিয়েই পতনটা ধেয়ে আসে। এরশাদ নিজেও এর সাক্ষী।

সংবাদটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on print
Print
Share on email
Email
Share on whatsapp
WhatsApp

কোন মন্তব্য নেই। আপনি প্রথম মন্তব্যটি করুন। on দু’টি অনুগল্প ও একজন এরশাদ

আপনি কি ভাবছেন ? আপনার মতামত লিখুুন।

এই বিভগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ