
সিলেটের রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন তুলেছে সিলেট–৪ আসনে আরিফুল হক চৌধুরীর মনোনয়ন প্রাপ্তি। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় তাকে ডেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট–৪ থেকে নির্বাচনে লড়ার নির্দেশ দিয়েছেন—এমনটাই জানিয়েছেন আরিফুল হক। সেখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়—দল কৌশলে ভিন্ন ঘরানা বেছে নিয়েছে।
দুই মেয়াদে সিলেটের জনপ্রিয় মেয়র হিসেবে নগরের রূপান্তরে যে দৃশ্যমান ছাপ আরিফুল রেখে গেছেন, তা কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় নয়—এটি তাকে রাজনৈতিকভাবেও এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সিলেটের যুগান্তকারী উন্নয়ন তাকে আজ “অবিসংবাদিত নগর–পিতা”র অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
মেয়র অবস্থান থেকেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন সিলেট–১ আসনের জন্য। সেখানে তার জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং উন্নয়নের রেকর্ড তাকে প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের দোরগোড়ায় নিয়ে যাচ্ছিল। তবু বিএনপি তাকে সিলেট–৪-এ নিয়ে গেলো একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশে—যে আসনে জয়ের জন্য প্রয়োজন ভারী নেতৃত্ব, বড় ব্যক্তিত্ব এবং মাঠে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলার সক্ষমতা। তিনটি শক্তিই দলের দৃষ্টিতে আরিফুলের ভেতর সবচেয়ে দৃঢ়। চ্যালেঞ্জকে নিজের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করার অভ্যাস যাঁর, তাকে দল আরও বড় পরীক্ষায় পাঠাতে কার্পণ্য করেনি। আর দলকে ভালোবেসে, নেতৃত্বকে শ্রদ্ধা করে আরিফুলও সিদ্ধান্তটি সাদরে গ্রহণ করেছেন।
আরিফুল হকের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য—দলের প্রতি আনুগত্য। পরপর দু’বার মেয়র হয়ে পুরো সিলেটের উন্নয়নচিত্র পাল্টে দেওয়ার পরও ২০২৩ সালে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করলে, নিশ্চিত জয় জেনেও তিনি সিটি নির্বাচনে অংশ নেননি। একই সময়ে দলের বহু নেতা সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে গেলেও, আরিফের আনুগত্য ও দায়বদ্ধতা তাকে দলের ভেতর বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে খালেদা জিয়া যখন ব্যক্তিগতভাবে তাকে ডেকে সিলেট–৪-এ লড়াইয়ের আহ্বান জানান, তা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তার ছিল না।
এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কম নয়। মাঠে তৎপর ১১ জন প্রার্থী—এর মধ্যে আটজনই বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। রয়েছেন কেন্দ্রীয় সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা হেলাল উদ্দিন আহমদ, সাবেক এমপি দিলদার হোসেন সেলিমের স্ত্রী জেবুন্নাহার সেলিম, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক সহ–স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদকে সামসুজ্জামান জামান, জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক ও এডিশনাল পিপি আল আসলাম মুমিন, এবং প্রবাসী বিএনপি নেতা আব্দুল হক।
তবে কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলে—জাতীয়তাবাদী মহল বিশ্বাস করে—এদের অধিকাংশই আরিফুল হকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবেন।
অন্যদিকে, এই আসনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন। জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের দুই মেয়াদের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এলাকায় ‘জৈন্তার রাখাল রাজা’ নামে পরিচিত। দুই যুগ ধরে মানুষের সুখ–দুঃখে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাশে থাকা তার গ্রহনযোগ্যতাকে আরও মজবুত করেছে।
কিন্তু সিলেট সিটির রূপান্তরের স্থপতি আরিফুল হকের ক্যারিশমা যে যেকোনো সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম—এ কথা তার কঠোর বিরোধীরাও মানতে বাধ্য। জৈন্তাপুর–গোয়াইনঘাট–কোম্পানীগঞ্জের মানুষ উন্নয়নকেই প্রাধান্য দেবে—এমন মনোভাবও স্থানীয়দের মধ্যে স্পষ্ট।
এ অঞ্চলটির ভৌগোলিক চরিত্র—খাসিয়া–জৈন্তিয়া পাহাড়, লালাখালের নীল জল, বিছনাকান্দি–পিয়াইন নদীর জলরাশি, সাদা পাথরের অপরূপ সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে সিলেট–৪ আসনকে পর্যটন–অর্থনীতির প্রাণভূমি হিসেবে দাঁড় করায়। পরিবেশ–রক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ–বান্ধব নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিং—এই সমন্বয় ছাড়া এ সম্ভাবনা বাস্তব উন্নয়নে রূপ পাবে না। আর এই জায়গাতেই আরিফুল হক চৌধুরীর অভিজ্ঞতা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। শহর–অর্থনীতি–পর্যটনকে একসুতোয় গাঁথার যে বাস্তব দক্ষতা তার রয়েছে—তা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে জরুরি।
স্থানীয়দের বড় একটি অংশের ধারণা—জৈন্তাপুর–গোয়াইনঘাট–কোম্পানীগঞ্জের অপার পর্যটন সম্ভাবনা বিকশিত করতে হলে দরকার এমন নেতৃত্ব, যার হাতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নির্ভরযোগ্য ব্লুপ্রিন্ট আছে। সেই জায়গায় আরিফুলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।
এখন দেখার বিষয়—ডায়নামিক আরিফুল হকের বিপরীতে ‘রাখাল রাজা’ জয়নাল আবেদীনের পাল্টা কৌশল কী দাঁড়ায়।
লড়াইটি হবে নিঃসন্দেহে সেয়ানে–সেয়ানে। আর এখান থেকেই সিলেটের রাজনীতিতে গড়ে উঠবে নতুন সমীকরণ।
মোহাম্মদ আতিকুর রহমান: সাংবাদিক, লেখক।
যুক্তরাজ্য।






কোন মন্তব্য নেই। আপনি প্রথম মন্তব্যটি করুন। on সিলেট–৪ : আরিফ কি পারবেন ‘রাখাল রাজার’ রাজত্বে আঘাত হানতে? মোহাম্মদ আতিকুর রহমান