মোনাওয়ার আহমদ
গত ৪ জুলাই আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখতে পাই যে আওয়ামীলীগপন্থী লেখক ও কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী জাতিসংঘের বিল্ডিঙে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত “বাংলাদেশ: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ” শীর্ষক এক আলোচনায় “আল্লাহর ৯৯ নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিল”, “আবু হুরাইরা নামের অর্থ হচ্ছে বিড়ালের বাবা, আবু বকর নামের অর্থ হচ্ছে ছাগলের বাবা”, “কাফেরদের মধ্যে যারা মুসলমান হয়েছিল তাদের নাম পরিবর্তন করা হয়নি… একটা নামও পরিবর্তন করা হয় নি”, “হিজাব এবং বোরখা হচ্ছে মওদুদীর শেষ মতবাদ”, “আমি জিয়াউর রহমানকে ঘৃণা করি” -এই সব কথা বলেন।
বাংলাদেশ নানান সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ। অমনিতেই একদিকে বিভিন্ন সূত্রে মদদপ্রাপ্ত উগ্র-নাস্তিকদের সয়লাব চলছে, অপর দিকে চলছে এক অনির্বাচিত সরকারের হাতে গুম, হত্যা, ঘুষ, জাতীয় সম্পদের হরিলুট, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আক্রমণ, দমন, নির্যাতন এবং জেলবন্দীকরণ। আজ এগুলোই জাতীয় সমস্যা। কিন্তু এসবের মধ্যে ধর্ম নিয়ে বাড়তি সমস্যা সৃষ্টি করায় কোন কল্যাণ খোঁজে পাওয়া যাবে না।
উল্লেখিত সেমিনারে আব্দুল গাফফার সাহেব যেসব কথা বলেছেন সেগুলো বলার কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? তারপর যেসব কথা বলেছেন সেগুলো কি সত্য? আমরা এগুলোর কিছু অংশ আলোচনা করতে যাচ্ছি।
আল্লাহ দেবতা (নাউযুবিল্লাহ) ও ৯৯ নাম
কাবা ঘরে আল্লাহ দেবতা নামে কোন দেবতা ছিল না। কাবা ঘরের বড় দেবতা ছিল হুবল। আরবগণ পৌত্তলিক হলেও আল্লাহকে ¯্রষ্টা, রব, রিজিকদাতা মানত। তাদের বিশ্বাসের দুইটি রূপ ছিল। এক, আল্লাহ হচ্ছেন আসমান ও জমিনের ¯্রষ্টা। তিনি রব। তিনি মেঘ-বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে প্রাণী জগতের রিজিক দান করেন। অনাবৃষ্টির সময় তারা আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য একটি নির্দিষ্ট পাহাড়ে গিয়ে সামষ্টিক দোয়া করত। আল্লাহকে সবকিছুর মালিক ভাবত। কোরানে এসেছে ‘আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন এই আসমান ও জমিন কে সৃষ্টি করেছেন, তারা বলবে “আল্লাহ”। বলুন, আল-হামদুলিল্লাহ’ (৩১:২৫)। এটি ছিল তাওহীদুর রুবুবিয়াহ, অর্থাৎ প্রতিপালক বা রবের একত্বে বিশ্বাস। মক্কাবাসীরা আল্লাহর কোন মূর্তি তৈরি করেনি। তাদের বিশ্বাসের দ্বিতীয় রূপ এই ছিল এই যে তারা যুদ্ধ জয়, নিরাপত্তা, বিপদ মুক্তি ইত্যাদির জন্য নানান দেবতার ইবাদত করত। আবার কিছু মূর্তির উপাসনা করত এই বিশ্বাসে যে এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর ‘নিকটবর্তী’ হতে পারবে (৩৯:৩)। তারপর পুরোহিতের মাধ্যমে মিথ্যাভাবে দেবদেবীর ইচ্ছার আনুগত্য করত, দেবদেবীর কাছে রোগমুক্তি, বিপদমুক্তি চাইত এবং এদেরকে তাদের উপাসনায় আল্লাহর সাথে শরীক করত। এই দ্বিতীয় অংশের বিশ্বাস ছিল তাওহীদুল উলুহিয়্যাত বা এক মা’বুদে বিশ্বাস ও আনুগত্যের প্রতিকূলে। এখানেই তারা আল্লাহর সাথে শরীক করত। তাওহীদুল উলুহিয়্যাত প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য, সকল প্রার্থনা, চাওয়া পাওয়া তার দিকে নিবদ্ধ করার জন্য নবী পাঠানো হয়। জাহেলী যুগে তারা হজ্জের তালবিয়ায় বলত: ‘হে আল্লাহ আমরা হাজির, আমরা হাজির। আপনার কোন শরীক নেই তবে সেই শরীক যে কেবল আপনারই। আপনি তার মালিক এবং তার সবকিছুর মালিক’ ১( আবুল মুনযির হিশাব ইবন আল-কালবী (৭৩৭-৮১৯ খৃ), কিতাবুল আসনাম পৃ.৭)।
মক্কা, তায়েফ ও নাখলা নামক স্থানে যথাক্রমে ‘মানাত’, ‘আল-লাত’ ‘আল-উজ্জা’ নামের তিন দেবীকে তারা আল্লাহর ‘কন্যা’ বলে বিশ্বাস করত। কোরানে এই নামগুলো ছাড়াও ‘ওয়াদ্দ’, সু‘আ, ‘ইয়াগুস’, ‘ইয়াউক’, ‘নাসর’ নামের মূর্তির উল্লেখ এসেছে (৭১:২৩)। ইবন আল-কালবী (৭৩৭-৮১৯ খৃ) তাঁর ‘কিতাবুল আসনাম’ (মূর্তি বিষয়ক পুস্তক) গ্রন্থে আবরদের দেবদেবীর নাম ও স্থানের তালিকা রচনা করেছেন। এতে আরও অনেক দেবদেবীর নাম এসেছে, যেমন রিয়াম, সা’দ, যুল-কাফফাইন, যুস-শাহরা, আল-উকাইসির, নুহম, আইম, সুইয়ার, আম্মু-আনাস ইত্যাদি। ইবন আল-কালবীর বর্ণিত নামগুলো ইসলাম-সমালোচক একটি খৃষ্টিয়ান ওয়েবসাইট কিছু ব্যাখ্যাসহ ইংরেজিতে প্রকাশ করেছে২ (নোটে লিঙ্ক দেখুন)। ইন্টারনেটে ওসানিজম (বা পৌত্তলিকতা) নামধারী একজন ইমানী পৌত্তলিক আরব দেশের দেবদেবীর নামের একটি লিস্ট সাজিয়েছেন। যদিও এই লেখাটি তার নিজের পৌত্তলিক দৃষ্টিকোণ ও ভাষ্য থেকে সাজানো হয়েছে তবুও তা দেখা যেতে পারে৩ (নোটে লিঙ্ক দেখুন)। ‘ওয়ানিজম’ তার সাইটে ইবন আল-কালবীর লিস্টও তার-মতো করে সমন্বয় করেছেন। এই সবগুলো নাম মিলিয়ে কোথাও ‘আল্লাহ’ নামের দেব-দেবী নেই, যেখান থেকে এডাপ্ট করা হয়েছে বলে দাবী করা যেতে পারে। তারপর ৯৯ নামেরও কোন মিল নেই। আল্লাহর ৯৯ নাম হচ্ছে গুণবাচক নাম। এসবের সাথে দেবদেবীর নাম দেখলেই স্পষ্ট বেমিল দেখা যায়।
সুতরাং আল্লাহর ৯৯ নাম পৌত্তলিক দেব-দেবীর নাম থেকে ধারিত হয়েছে এমন কথা গাফফার চৌধুরী কীভাবে বলতে পারেন? তিনি কি ঐতিহাসিকভাবে সকল দেব-দেবীর নাম, স্থান ও তাদের গোত্র সম্পর্কিত “সঠিক তথ্য” ক্রেডিবল সূত্রে সূত্রায়িত করতে পারেন? তিনি তার বক্তৃতাকে ‘একাডেমিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। একাডেমিক বক্তৃতা কি গাজী কালুর পুঁথির মত হয়? কোনো রেফারেন্স উল্লেখের প্রয়োজন হয় না?
মূল কথা হচ্ছে ইব্রাহীম ও ইসমাঈলের (আ) মাধ্যমে এই অঞ্চলে যে তাওহীদী ধর্ম প্রচারিত হয়, সেই ধর্ম প্রায় দুই হাজার বছর পরও আরবের মাটিতে শেষ হয়ে যায় নি। কেবল নবীর (সা) প্রায় সাড়ে তিন শো বছর আগে আমর বিন লু’হাই নামক এক খুজায়ী গোত্র-প্রধান, (যাদের অধীনে তখন কা’বার ব্যবস্থাপনা ছিল), পৌত্তলিকতা সিরিয়া থেকে আমদানি করে। কিন্তু তাতেও দ্বীনে ইব্রাহীম (আ) শেষ হয়ে যায় নি বরং নবী মুহাম্মাদ (সা) যুগ পর্যন্ত কিছু লোক ‘হানাফী’ আন্দোলনের মাধ্যমে তা চালিয়ে যান। সুতরাং মক্কাবাসী এবং সাধারণ আরবগণ আল্লাহর ইবাদত না করলেও অনেকের কাছে তাঁর নাম ও ধারণার বিষয় স্পষ্ট ছিল।
এই অঞ্চলে কখনো পৌত্তলিকতা ইসলামের পূর্ববর্তী (preceeded) ছিল না বরং ইসলামই ছিল পূর্ববর্তী। পৌত্তলিক উৎস থেকে দেব-দেবীর নাম আমদানী করে অথবা এডাপ্ট করে তাওহীদের বাণী প্রচারের কথা কল্পনাই করা যায় না। এটা কেবল গাফফার চৌধুরী এবং তার শ্রেণী ও ঘরানা করতে পারেন।
গাফফার সাহেব ‘কিছু দিন’ মাদ্রাসায় পড়েছেন। কিছুদিন মাদ্রাসায় পড়লে যা হয় তার বক্তৃতা হচ্ছে সেই প্রমাণ। তিনি যদি দীর্ঘ দিন পড়তেন তাহলে এসব কথা বলতেন না। তার বক্তৃতায় আরবি ও ইসলাম নিয়ে যা বলেছেন তার বেশির ভাগ কথাই সঠিক নয়। আমরা এবারে ‘নামের’ বিষয়টি দেখি।
আবু কি?
আরবি ‘আব’ বা ‘আবু’ কেবল পিতার অর্থে ব্যবহƒত হয় না। বরং মালিক অর্থে, অধিকারী অর্থে, মুলাজামাহ বা সংশ্লিষ্টতার অর্থে ব্যবহƒত হয়। যেমন ধরুন, আবুল ফজল। ফদল বা ফজল হচ্ছে প্রাচুর্যের অর্থবাহী শব্দ, যা বেশির অর্থে এবং কমতির বিপরীতে। এটা আচার আচরণের মাধুর্যের ক্ষেত্রেও আসে। তাই এ আবুল ফজলের অর্থ কি হবে? ‘বেশির বাপ’? না। বরং এর অর্থ হবে প্রাচুর্যের অধিকারী। দুধকে ‘আবুল আবইয়াদ’ বলা হয়। আবইয়াদ হচ্ছে সাদা। তাহলে দুধ কি ‘সাদার বাপ’? ধরুন, আবুল হায়াত। হায়াত অর্থ জীবন। তাহলে ‘আবুল হায়াত’ কি জীবনের বাবা? না। এর অর্থ হবে জীবনধারী, বা জীবনমুখী। এটা বৃষ্টির অর্থেও ব্যবহƒত। কেননা এর ফলে মাটিতে জীবনের সঞ্চার হয়। এসব বিষয় বুঝতে হলে দীর্ঘ কাল মাদ্রাসায় পড়তে হয়।
‘আবু হুরাইরাহ’র অর্থ ‘বিড়ালের বাবা’ নয় বরং একটি ছোট্ট বিড়ালের মালিক বা যার অধিকারে একটি ছোট্ট বিড়াল আছে। ‘আবু বকরের’ অর্থ ‘ছাগলের বাবা’ নয় বরং তরুণ উষ্ট্র বা উষ্ট্র বাছুরের মালিক, বা যার অধিকারে/তত্ত¦াবধানে তরুণ উষ্ট্র বা বাছুর রয়েছে, (নবীন, যৌবনধারী, এবং অগ্রগামীর ধারণায়ও নেয়া যেতে পারে)। এই নামগুলোতে মন্দের কিছু নেই। এতে হাসি তামাশারও কিছু নেই। এই নামগুলো মহান সাহাবীদের (সা) হওয়ায় এসবের তাৎপর্য মুসলিম সমাজে, ভিন্ন আঙ্গিকে, অপরিসীম।
নাম পরিবর্তন হয় নি?
আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন, “কাফেরদের মধ্যে যারা মুসলমান হয়েছিল তাদের নাম পরিবর্তন করা হয়নি… একটা নামও পরিবর্তন করা হয় নি”। এটা হচ্ছে ভুল কথা। কিছু না জেনে বলা হয়েছে। এমন ধরণের কথায় ‘একাডেমিক’ শব্দ আরোপণ হাস্যকর।
ইসলামের বিশ্বাসের সাথে যেসব নামের বিরোধ ছিল সেসব নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। যাদের নাম দেব-দেবীর সাথে জড়িত ছিল যেমন আব্দুল উজ্জা (উজ্জা-দাস), আব্দুস শামস (সূর্য-দাস), আব্দুল কা’বাহ (কা’বাহ-দাস) ইত্যাদি নাম পরিবর্তন করে আব্দুল্লাহ, আব্দুর রাহমান এই জাতীয় নামকরণ করা হয়েছে। ‘আল্লাহ’ নামের কোন দেবতা থাকলে আব্দুল্লাহ (আল্লাহর দাস) করা হত না, কেননা এক দেবতার নাম পরিবর্তন করে আরেক দেবতার নামে নামকরণের কোন অর্থ হয় না।
তারপর যেসব নামে মন্দ তাৎপর্য ছিল তাও পরিবর্তন করা হয়েছে। যেসব নারীর নাম বুররাহ (গন্ধময় বৃক্ষ, নষ্ট শস্যকণা) ছিল তা পরিবর্তিত হয়েছে। রাসূলের (সা) স্ত্রী যাইনাবের (রা) পূর্ব নাম ছিল বুররাহ, রাসূল (সা) তা পরিবর্তন করে ‘যাইনাব’ (সুগন্ধময় বৃক্ষ) করেন। যেসব নামে পাপ ও অবাধ্যতার ধারণা ছিল তাও পরিবর্তিত হয়। যেসব নারীর নাম আসিয়াহ (অবাধ্য) ছিল, সেগুলোও পরিবর্তিত হয়। এক আসিয়া মেয়ের নাম ‘জামিলাহ’- ‘সুন্দর’ করা হয়, আরেকজনের নাম জুওয়াইরিয়াহ (ছোট্টমেয়ে [আদরের অর্থে]) করা হয়। এক ব্যক্তির নাম ‘হাযন’ (কঠোর, রূঢ় ও অমসৃণ [ভূমি]) ছিল তা বদলে দিয়ে সাহল (সহজ ও মসৃণ [ভূমি]) করা হয়। হারব (যুদ্ধ) নামকে সালাম (শান্তি) করা হয়। বানু গাইয়্যা (‘নীতিভঙ্গকারী, বিদ্রোহী গোত্র’) পরিবর্তন করে বানু-রোশদান (আলোকপ্রাপ্ত, পথ-প্রদর্শিত গোত্র) করা হয়৪। এভাবে অসংখ্য নজির রয়েছে।
অনেক স্থান ও পাহাড়ের নাম মন্দ থেকে ভাল নামকরণ করা হয়েছে। হিজরতের পূর্বে মদিনার শহরের নাম ছিল ‘ইয়াসরিব’। ইমাম নববী ও ইবন হাজর বলেন ‘ইয়াসরিব’ শব্দ ‘তাসরিবের’ সাথে জড়িত, যার সাথে নিন্দা ও দোষারোপের অর্থ সংযুক্ত। তাই তাই নবী (সা) এটাকে পরিবর্তন করেন। পুরাতন নাম যাতে দ্রুত অভ্যাস থেকে সরে যায় এবং নতুন নাম আত্মস্থ হয়, এজন্য নবী (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি (ভুলে) ইয়াসরিব বলে ফেলবে তার কাফফারা হবে দশ বার ‘মদিনাহ’ ‘মদিনাহ’ শব্দ উচ্চারণ করা”৫
কোন ব্যক্তি এসব জ্ঞান কিছুদিন মাদ্রাসায় পড়ে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিষোদ্গার করে ও ব্যক্তিক প্রতিপক্ষকে কুনোই মেরে জীবন কাটালেও অর্জিত হতে পারে না। এর জন্য ব্যাপক পড়াশুনার প্রয়োজন হয়।
মাওদূদীবাদ?
তার দৃষ্টিতে “বাংলাদেশের জামাত দ্বীনে মোহাম্মদী নয়, তারা হচ্ছে দ্বীনে মওদুদী। হিজাব এবং বোরখা হচ্ছে মওদুদীর শেষ মতবাদ।” তার কথা যে সম্পূর্ণ মিথ্যা তা তার বাক্যের মধ্যেই নিহিত। হিজাব, বোরখা- এগুলো মাওদূদী (র) চালু করেন নি। তিনি জানেন না এগুলো ইসলামেরই প্রথা। জনতাকে ঠকাতে মাওদূদীর কাঁধে বন্দুক স্থাপন করে এই শ্রেণীর লোক যুগ যুগ ধরে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন। “মাওদুদীবাদ” হচ্ছে অপরাপর প্রোপাগান্ডার মত আরেকটি প্রোপাগান্ডা। অপপ্রচারের হাতিয়ার। গুজব। কৌশলে আরোপিত। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রসার ঘটানো। ‘নির্মূল-ঘরানা’ই এর চালিকাশক্তি।
মাওদূদীবাদ বলতে কোন জিনিস নেই। তবে এটা সত্য যে মাওলানা মাওদূদী (র) ইসলামী খিলাফত বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রবক্তা ছিলেন এবং এর পক্ষে বই পুস্তক প্রণয়ন করেছেন। মাওদূদী (র) ‘জামাতে ইসলাম’ নামক দলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। জামাতে ইসলাম খিলাফত বা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতি করে আসছে, তবে এখন তাদের সাথে আরও সম্মিলিত ইসলামী দল রয়েছেন। সকলের উদ্দেশ্য একটিই। এখানে নতুন কোন ‘ইজম’ নেই, নতুন কোন ‘বাদ’ নেই। নাস্তিক এবং উগ্র-বামপন্থি দল তাদের প্রতিপক্ষকে ঠেকাতেই মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ, স্ট্যালিনবাদ, মুজিববাদ ইত্যাদির ধারণায় এটাকে ‘ইজম’ বা ‘বাদের’ আওতায় এনে মাওদূদীর সাথে জড়িয়ে দিয়েছে। যারা ইসলামের ইতিহাস, এবং বিশেষ করে ইসলামী খিলাফত ও ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবগত নন তাদেরকে এই ‘ইজমের’ প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত করাই উদ্দেশ্য।
‘বাদ-’ এর ধারণা
আভিধানিক দৃষ্টিতে হচ্ছে কোনো বিষয়ের উপর নতুন মতবাদ বা থিওরি (A distinctive doctrine, system, or theory)। আমরা মার্ক্সের মতবাদকে ‘মার্ক্সবাদ’ বলে থাকি কেননা সমাজ-দার্শনিক কার্ল মার্কস প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মোকাবেলায় একটি নতুন দর্শন উপস্থাপন করেন। তার এই মতবাদটি তদানীন্তন আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ধারণা ও প্রচলিত অন্যান্য ধারণা থেকে আলাদা ছিল- তাই সেখানে মার্ক্সবাদ এসেছে। মার্কসের ধারনা থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে লেলিন যে আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং এতে যে ভিন্নতা প্রকাশ পায় একারণে এটি হয় ‘লেনিনবাদ’।
জামাত, মাওদূদী এবং অপরাপর কোন দলই মার্ক্স, লেনিন, স্ট্যালিনের ন্যায় নতুন কিছু উপস্থাপন করেন নি। এটা সেই পুরানো ধারণা যার কথা যুগ যুগ ধরে আলেম উলামাগণ বলে আসছেন এবং লিখে আসছেন। এর পরিভাষা হচ্ছে ‘খেলাফত আলা মিনহাজ আন-নুব্যুয়্যাহ’ (অর্থাৎ নব্যুয়তের আদলে ও মূলনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত খেলাফত বা শাসন ব্যবস্থা)। মাওদূদী (র) যদি এই ‘খেলাফত আলা মিনহাজ আন-নুব্যুয়্যাহ’র পরিবর্তে অন্য কোন ব্যবস্থার কথা বলে থাকতেন তবেই তা মাদূদীবাদ হতে পারত, অন্যথায় নয়। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে আব্দুল গাফফার সাহেব ও তার ঘরানার অভিযোগের মধ্যে কোন ঐতিহাসিক সত্যতা নেই।
বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ
“আমাদের সৌভাগ্য হচ্ছে আমরা আগে বাঙালি তারপরে মুসলমান”- এই কথাটি সঠিক নয়। একটি সমাজে মানুষের বহুবিদ পরিচিতি থাকতে পারে কিন্তু কোন পরিচিতি ক্রমধারায় আসে না। আমি বাঙালী-অবাঙালীর কোন সভায় ভাষিক পরিচিতির ক্ষেত্রে বলতে পারি ‘আমি বাঙালী’। ধর্মীয় গ্রুপের সভা-সেমিনারে গেলে বলতে পারি ‘আমি মুসলিম’। একই দেশের বিভিন্ন স্থানের লোকদের মিলিত সভায় বলতে পারি ‘আমি সিলেটী’। এভাবে আমাদের পরিচিতি কাজ করে। এখানে স্বতঃসিদ্ধভাবে, চিরন্তনী এবং ঢালাও রূপ দিয়ে ‘আমি প্রথমে বাঙালী’ এমনটি বলার অবকাশ নেই। এভাবে ‘অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে’ ইসলামকে ‘পরে’ নেয়াতে এই বঙ্গালবাদীদের কৌশল রয়েছে। বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ক্রমশ ফ্যাসিবাদের দিকে নেয়া হচ্ছে, এটা ভাল কিছু নয়।
মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে অনেক জাতি ও গোত্রের বসবাস। এই বহুজাতিক দেশের জাতীয়তা ‘বাঙালী’ হতে পারে না। এই জাতীয়তা যদি গঠনতন্ত্রে গৃহীত হয়ে যায়, তবে তা হবে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক কাজ, কেননা এতে অনেক সংখ্যালঘু যেমন মনিপুরী, চাকমা -এমন সবাই প্রথমেই সাংবিধানিকভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে পড়েন এই অর্থে যে দেশের সংবিধান যাদের জাতীয়তাকে ‘সাংবিধানিক রূপ ও স্বীকৃতি’ দেয় তারা হল কেবল “বাঙালী”। এই ভূখ-ের জাতীয়তা হবে ‘বাংলাদেশি’ যা সংবিধানিক ও সার্বিকভাবে সকল সম্প্রদায়কে ধারণ করবে।
গাফফার সাহেবের দ্বিতীয় ভিডিও
দ্বিতীয় ভিডিওতে গাফফার সাহেব যদি বলতেন, ভাইসব, আমি বৃদ্ধ লোক; কী বলতে কী বলে ফেলেছি, আমার সব কথা খেয়ালে ছিল না; আমার ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাই। আর আপনারাও আমাকে সুনজরে দেখবেন। এটা হয়ত সুন্দর দেখাত।
কিন্তু তা না করে তিনি বাড়তি আইটেম সংযোগ করেছেন। এবারে কথাগুলো এই মর্মে যে হজ্জ নাকি কাফিরদের সৃষ্ট প্রথা থেকে এসেছে; রাসূলুল্লাহর পিতার নামকরণ নাকি হয়েছিল আল্লাহ দেবতার নামে, এটাকে নাকি কেউ কেউ ইলাহ বলে তারপর আরবি না জেনে আরবি নাম রাখা নাকি ভুল; রাসূলুল্লাহ নাকি ‘ঠাট্টা’ করে আবু হুরাইরাহকে ‘আবু-হুরাইরা’ বলে ডাকতেন, ইত্যাদি। তার এসব কথা ভুল।
হজ্জ আল্লাহর নির্দেশেই ইব্রাহীম (আ) শুরু করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ) আল্লাহর নির্দেশে কাবা ঘর নির্মান করেন এবং আল্লাহর নির্দেশেই মানুষকে হজ্জের আহবান করেন (সূরাতুল হজ্জ, আয়াত ২৭)। এই প্রথা প্রায় দুই হাজার বৎসর সেভাবেই ছিল। পরে আমর বিন লুহাই কর্তৃক পৌত্তলিকতা শুরু হওয়ায় এতে কিছু পরিবর্তন আসে, যা ইসলামে এসে সংশোধিত হয়। এই আলোচনা উপরে এসেছে। আবু-হুরাইরাকে (রা) রাসূল (সা) ঠাট্টা করে বিড়ালের বাবা’ ডাকেননি, কেননা “ঠাট্টা”র চরিত্র নবীর (সা) ছিলই না। তারপর আরবি ভাষা না জেনেও বাচ্চাদের নাম আরবি রাখাতে কোন অসুবিধে নেই। আবহমানকাল থেকে আলেম-উলামাগণকে জিজ্ঞেস করে বাচ্চাদের নাম রাখা হচ্ছে এবং মা-বাপ নিজেরাও বইপুস্তক দেখে এবং প্রচলিত নাম অনুসারে তাদের বাচ্চাদের নামকরণ করছেন এতে কোন সমস্যা নেই। সাহাবীদের (রা) নামের মাহাত্ম্য যে কী, তা আবু-হুরাইরা হোক অথবা আবু বকর, তা গাফফার সাহেব না জানলেও মুসলমানগণ জানেন, তাই তারা এই নামগুলো রাখেন।
ইলাহ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য
গাফফার সাহেব ‘ইলাহ’ উল্লেখ করে যা বলতে চেয়েছেন তাও সঠিক নয়। তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। কাবার ভিতরে বা বাহিরে ‘ইলাহ’ নামক কোন একক বড় দেবতা ছিল না যার নাম থেকে আল্লাহ নাম ধারিত হয়েছে। শব্দ ও অর্থের দিক থেকে ‘ইলাহ’ হচ্ছে সে যার ইবাদত করা হয় ‘মা’বুদ’ বা উপাস্য। ইবাদত করলেই সে হয় ইলাহ। এই বিশ্বের যত দেব-দেবী আছে, যাদের উপাসনা হয়, তারা সবাই ইলাহ। এখানে বড় দেবতা বা ছোট দেবতার কথা নেই। ছোট হোক বড় হোক, ইবাদত করা হলেই সে হয় ইলাহ।
কোরানের মূল কথা ছিল যে, হে মানুষ, তোমরা যাদের উপাসনা করছ তারা ইলাহ নয়, তোমরা ওদের ইবাদত কর না, ওদের মা’বুদ হিসেবে গ্রহণ কর না। তোমাদের ইলাহ তো কেবল একজনই, তিনি হচ্ছেন আল্লাহ। নিন্দিষ্ট অর্থে, অর্থাৎ যেখানে আর কোন ইলাহ নেই, ইলাহ হওয়ার উপযুক্ত নয়, সেখানে তিনিই হচ্ছেন আলইলাহ বা আল্লাহ। সুতরাং কোন বড় দেবতার নাম ইলাহ ছিল এবং তাত্থেকে আল্লাহ নাম ধারিত হয়েছে, এটা ভুল ধারণা।
আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের অধিকর্তা। তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই’ (৭৩:৯)। তিনিই নভোমন্ডলে ইলাহ এবং তিনিই ভূম-লে ইলাহ। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ’ (৪৩:৮৪)।
কি উদ্দেশ্য এসব কথা?
আব্দুল গাফফার সাহেব হঠাৎ করে এইসব কথা বলার কারণ কি? সরকার মহলে কি কোন সংকট দেখা দিয়েছে যাতে কারো মাধ্যমে টানানোর প্রয়োজন হয়েছে? কোন রাজনৈতিক সংকট কি অন্য আবরণে ঢাকার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে? সরকারের এবং বিশেষ করে মুজিব-কন্যা হাসিনার অতিরিক্ত প্রশংসার মাধ্যমে নিজের জন্য ভিন্ন কোন অবস্থান তৈরি হচ্ছে? কোন ক্ষেত্রে কী ধর্মীয় বিষয় টেনে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে? বাঙালী জাতীয়তাকে ইসলামের মোকাবেলায় স্থাপনের কোন ভিন্ন উদ্যোগ এসেছে?
“আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, মৌলবাদী রাষ্ট্র আমরা চাই না, আমরা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই” এমন অনেক অর্থ বহন করতে পারে। তারপর দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের ধারণা, “বাঙালি জাতি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখবে” এ দৃষ্টি থেকে দেশ কি দ্বিতীয় যুদ্ধের নতুন কোন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে বলে চিন্তা করা যেতে পারে?
তাছাড়া, আরও উদ্দেশ্য বিবেচনা করা যেতে পারে। চৌধুরী সাহেব কি নতুন কোন বই লিখেছেন যার কাটতি বাড়ানোর প্রয়োজন থাকতে পারে? তবে আমার মনে হয় এতে কয়েক উদ্দেশ্যের সংমিশ্রণ থাকতে পারে।
নোটস/লিঙ্কস:
১. ইবন আল-কালবী, (প্রকাশনা-কাল লেখা নেই), কিতাবুল আসনাম (আরবি), প্রাপ্তব্যস্থান : http://ia700805.us.archive.org/14/items/asnamasnam/asnam.pdf
২. প্রকাশক: আনসারিং-ইসলাম, আল-কালবীর ‘কিতাবুল আসনাম’ থেকে দেব-দেবীর নাম ও স্থান। প্রাপ্তব্যস্থান: http://answering-islam.org/Books/Al-Kalbi/
৩. Wathanism, (2013). Arabian Paganism: Ritual and practices in pagan Arabia, 21 October 2013, available at: http://wathanism.blogspot.co.uk/
৪. Ali>q, Bassa>m Muh}ammad, (2001): Al-Wa>fi> fi> al-Isma>’ al Arabiyyah wa m’a>ni>ha>, Lebanon: al-Tiba>’h wa al-Nashr wa al-Tawthi>q wa al-Tawzi>’, p.10
৫. Narrated by A<mir bin Rabi>’ah, Al Jami’ al Kabi>r by Suyuti Vol 4, 14th edition, cited in Abdulkarim, K (1998) Muh}}ammad wa al S}aha>bah, al-Qa>hirah: Si>na> li al Nashr, 2nd edition, p.59)
এই লেখাটি গত ৫ই জুলাই ইন্টারনেটের এক ই-জার্নেল সাইটে প্রকাশ হয়েছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক (সমাজবিজ্ঞান), ভাষা তাত্ত্বিক।






কোন মন্তব্য নেই। আপনি প্রথম মন্তব্যটি করুন। on আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্য: দেশ কি নতুন কোন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে?