//মোহাম্মদ আতিকুর রহমান//

১৯৭১সাল। পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত হতে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছে বাংলার দামাল ছেলেরা। নেই কোন অস্ত্র, নেই কোন প্রশিক্ষণ, নেই কোন প্রস্তুতি। তারপরও শুধুমাত্র দেশ মাতৃকাকে ভালোবেসে প্রশিক্ষিত পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু করেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। যুদ্ধের দামামা বাজছে পুরো দেশ জুড়ে। সে এক বিভীষিকাময় মুহুর্ত। বসে নেই প্রবাসের বাঙ্গালীরাও।
ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সবধরনের সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন জায়গায় প্রবাসীরা নিয়মিত সভা সমাবেশ করে যাচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য একটিই। যে করেই হোক দেশ মাতৃকাকে সাহায্য করতে হবে।
এরই মাঝে এক অসম্ভবকে সম্ভবে পরিনত করে দিলেন ইংরেজ ভূ-খন্ডের মধ্যভূমিতে বসবাসরত কয়েকজন তরুণ। যেহেতু তাদের সবার পাকিস্তানী পাসপোর্ট ছিলো তারা ঘটা করে সেই সব পাসপোর্ট জ্বালিয়ে দিলেন। হয়ে গেলেন পুরোপুরি রিফিউজি। সে মুহুর্তে তারা আদৌ জানতেন না দেশ স্বাধীনতার মুখ দেখবে কি না, নিজেদের ভবিষ্যতকে কতোটুকু অনিশ্চয়তায় ফেলে তারা এ কাজ করেছেন এটা ভাবলেই এখন গায়ে কাটা দিয়ে উঠে। দেশের প্রতি কী এক অকৃত্রিম ভালোবাসা থাকলে এটা করা সম্ভব?
সেসময় দিনটি ছিলো ১৯৭১ সালের রোববার। সাপ্তাহিক ছুটির এ দিনে ঘোষণা দিয়ে সমাবেশ ডাকা হয় ঐতিহাসিক স্মলহিথ পার্কে। বাংলাদেশ এ্যাকশন কমিটির ব্যানারে তুলনায় অনেক বড় পাকিস্তানি কমিউনিটির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সেদিন স্মলহিথ পার্কে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় দশ হাজার বাংলাদেশী। আর ঐতিহাসিক সেই সমাবেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আফরোজ মিয়া, জগলুল পাশা, তোজাম্মেল টনি হক, আজিজুল হক ভূঁইয়া, খলিলুর রহমান, সৈয়দ আব্দুর রহমান, ইসমাইল আলী আজাদ, আলী আকবর, গণেশ চন্দ্র দে, সফিয়ার আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান দিপু, জমশেদ আলী, সবুর চৌধুরী, জহুর আলী, বদরুন নেছা পাশা, ডাক্তার আব্দুল খালিক, ইব্রাহিম আলী, মিছির আলী, ফয়জুর রহমান চৌধুরী এমবিই, মিসেস খালিক, আব্দুর রশিদ ভূইয়া, মিসেস ভূইয়া, পাশা খন্দকার প্রমুখ।
তাদের চোখে মুখে অনেক স্বপ্ন। একটি স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক হবার আকাংখা। সে সভা থেকেই বাংলাদেশে মুক্তিসংগ্রামে সহায়তার জন্য ফান্ড সংগ্রহের ঘোষণা দেয়া হয়। তারা পাঠ করেন শপথ বাক্য। বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে কাজ করা বাংলাদেশীরা নিজের পরিবার সন্তানদের কথা চিন্তা না করে তাদের সপ্তাহের পুরো বেতন সেদিন মুক্তিযুদ্ধের সহায়তা ফান্ডে জমা দিয়েছিলেন। আয়রণ লেডি খ্যাত ২৮শে মার্চের অন্যতম উদ্যোক্তা বদরুন নেছা পাশা তার গলার হার খুলে দিয়ে বলেছিলেন ‘এ দিয়েই শুরু হোক মুক্তিযুদ্ধের ফান্ড…’।
এদিকে এরকম একটি মুহুর্তে একটি ঐতিহাসিক কাজ করে ফেলেন সমাবেশ আয়োজন করা সেদিনের কয়েকজন স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা। তারা বাংলাদেশের পতাকা সমাবেশের মাঝখানে পত পত করে উড়িয়ে দেন। দু’হাত ধরে নাড়াতে থাকেন একটি স্বাধীন জাতির বহু আকাংখিত আবেগ মথিত ভালোবাসার ঝান্ডা, বাংলাদেশের পতাকা। আর এটাই ছিলো বাংলাদেশের বাইরে বহি:র্বিশ্বে সর্বপ্রথম বাংলাদেশী পতাকা উত্তোলন যা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন সেদিনের স্বপ্নবাজ কিছু তরুণ। তারা সমস্বরে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন পৃথিবীর বুকে মানচিত্র বদলের আগমনী বার্তা।
আর এর পরের কাহিনী তো সবারই জানা। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমাদের বীর সেনানীরা আমাদের জন্য ছিনিয়ে আনলেন লাল-সবুজের ছোট্র একটি পতাকা। আকারে ছোট্র হলেও এর অর্থ আমাদের কাছে বিশাল। আর বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করলো এক বীর জাতির আগমন।
কিন্তু অত্যন্ত দু:খ ও পরিতাপের বিষয় এই যে, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো বহি:র্বিশ্বে সর্বপ্রথম পতাকা উত্তোলনের স্বীকৃতি পায়নি বার্মিংহামের স্মলহিথ পার্ক। অফিসিয়ালভাবে এখনো তা ভারতের কলকাতা বলে উল্লেখ রয়েছে। যেখানে প্রবাসীরা পাকিস্তানীদের হামলার শিকার হয়ে, ছুরিকাঘাত হয়ে, জীবন বাজী রেখে দেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন সেখানে তাদের স্বীকৃতি প্রদানে কেনো এতো গড়িমসি? কেনো বার্মিংহামবাসীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তাদের আত্মত্যাগ ও অর্জনের স্বীকৃতি প্রদান থেকে।
শুধু তাই নয় এদেশে বেড়ে উঠা আমাদের নব প্রজন্মদেরও আমরা আমাদের এই বীরত্বগাথা, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার কতোটুকুই বা জানাতে পেরেছি? বিশেষ করে এই দেশের আলো বাতাসে বেড়ে উঠা আমাদের সন্তানেরা কী জানবে না তাদের প্রকৃত ইতিহাস! আর যারা দূর প্রবাস থেকে খেয়ে না খেয়ে নিজের অর্জিত সর্বস্ব দিয়ে দেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে সাহায্য করে গেছেন তাদেরই বা আমরা কতোটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছি? আমাদের সন্তানদের কী জানানো উচিত না এই বার্মিংহামের আমাদের পূর্বপুরুষরা পাকিস্তানিদের হুমকী-নির্যাতন উপেক্ষা করে বহি:র্বিশ্বে সর্বপ্রথম পতাকা উত্তোলন করেছিলেন? স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো ২৮শে মার্চের স্বীকৃতি আদায়ে আন্দোলন করে যেতে হচ্ছে বার্মিংহামবাসীকে। দলীয় পরিচয়ে প্রবাসে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে হাতে গুনা কয়েকজন স্বীকৃতি পেলেও প্রকৃত সংগঠকদের স্বীকৃতি এখনো মেলেনি। সে দিনের সেই ঐতিহাসিক সমাবেশের অন্যতম উদ্যোক্তাদের বেশীরভাগই গত হয়েছেন তাদের স্বীকৃতি না দেখে। এখন হাতে গুনা কয়েকজন জীবিত রয়েছেন তারা যদি জীবতবস্হায় তাদের স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেন তবে সেটাই হবে তাদের প্রতি আমাদের বিশেষ শ্রদ্ধা।
খোজ নিয়ে জানা গেছে এ সংক্রান্ত ফাইল বর্তমানে বাংলাদোশের প্রবাসী কল্যান মন্ত্রনালয়ে বিভিন্ন জটিলতায় আটকা রয়েছে।
আশা করি অচিরেই বাংলাদেশ সরকার বহি:র্বিশ্বে সর্বপ্রথম পতাকা উত্তোলনের স্হান হিসেবে বার্মিংহাম এবং প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের স্বীকৃতি প্রদান করবে। সেই প্রত্যাশায়।
লেখক: মোহাম্মদ আতিকুর রহমান: সাংবাদিক, কলামিস্ট
বার্মিংহাম






কোন মন্তব্য নেই। আপনি প্রথম মন্তব্যটি করুন। on বহির্বিশ্বে প্রথম পতাকা উত্তোলন: স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও স্বীকৃতি পেলো না বার্মিংহামবাসী