সাহিত্যে ফ্যাশন ও স্টাইল

প্রবন্ধ-নিবন্ধ শিল্প-সাহিত্য

সাহিত্যে ফ্যাশন ও স্টাইল

মু হা ম্ম দ ফ রি দ হা সা ন

শুরুতেই বলে রাখা ভালো ‘ফ্যাশন’ ও ‘স্টাইল’ শব্দ দুটোকে প্রায়ই একত্রে এবং একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও মূলত দুটো শব্দেরই ব্যবহারিক প্রয়োগে ফারাক বিস্তর। ফ্যাশন

হচ্ছে হাল যুগের জন্য আর স্টাইল হচ্ছে মহাকালের। ক্ষণস্থায়ী ও দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে যে তফাৎ ফ্যাশন ও স্টাইলের ক্ষেত্রে সেই একই কথা প্রযোজ্য। প্রথমেই বলে রাখছি, এই

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সাহিত্য জগতের ফ্যাশন ও স্টাইল নিয়ে এবং এতে আমরা চূড়ান্তভাবেই দূরদৃষ্টিতে চোখ নিবদ্ধ রাখব।

সাহিত্য জগতের গণ্ডিতে ফ্যাশনের গুরুত্ব কিংবা একটি নিজস্ব স্টাইলে লেখার অনস্বীকার্য আবেদন অবশ্যই অর্থবহ। তবে সে ক্ষেত্রে যে লেখক তার রুচিবোধকে, লেখার ধরনকে

স্টাইলের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবেন, তিনিই সাহিত্যের সৃষ্টি সমুদ্রে জায়গা করে নিতে সক্ষম হবেন। ফ্যাশন যে গুরুত্বহীন নয় তা আগেই উল্লেখ করেছি।

লেখকদের জন্যই ফ্যাশন। সাহিত্যকর্মীরা সব সময় নবসৃষ্টির প্রয়াসে তাদের লেখনী শাণিত করে থাকেন। তারা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লেখার ফর্ম পাল্টানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। আবিষ্কার করতে চান তুলনামূলক পাঠকগ্রাহী কোনো কিছু। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার রচনাগুলোতে নানা আঙ্গিক, নতুন নতুন শব্দ চয়ন, বাক্য গঠনে ভিন্নতার প্রয়াস স্পষ্টত থাকে। এ ক্ষেত্রে কবিতার কথাই ধরা যাক। বর্তমানে কবিতার ফর্ম নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট বেশি হচ্ছে। রবীন্দ্র-নজরুল, জীবনানন্দ-সুকান্ত বলয়ের পর শামসুর রাহমান কিংবা আল মাহমুদ-এর ফর্ম থেকে বেরিয়ে এসে নতুন কোনো ফরম্যাটে কবিতা লেখার চেষ্টা সমসাময়িক সাহিত্যিকেরা করে যাচ্ছেন। পূর্বসূরিদের বলয় বা আঙ্গিক থেকে কবিতাকে তারা বের করে আনলেও তাদের ধারা জনপ্রিয় হয়নি। পাঠকের মনের চাহিদার সাথে তাদের কবিতা মিশে যেতে পারেনি, যেমনটা পেরেছিলেন আগের কবিতা সাধকেরা। বরং কবিতার ফর্মে এখন জেঁকে ধরেছে দুর্বোধ্যতা, অস্পষ্টতা। কবিতা হয়ে পড়েছে আবৃত্তি অনুপোযোগী। আল মাহমুদ যেমন তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ রচনার পর বাংলা কবিতার ভিতকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন, আবদুল মান্নান সৈয়দ যেমন পরাবাস্তব কবিতার মাধ্যমে বাংলা কবিতায় জাগরণ এবং একই সাথে বিস্ময় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন- এখনকার কবিরা পাঠকদের তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা তেমন কিছুই উপহার দিতে পারছেন না। প্রথিতযশা কবি ওমর আলী এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান কবিতা নিয়ে বলেছেন, ‘এখনকার কবিতায় উল্লেখযোগ্য বাঁক বদল হয়নি।’ অথচ ফ্যাশনের আঙ্গিকে এসে বর্তমান লেখকেরা জনপ্রিয়, একই সাথে শৈল্পিক একটি ধারা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু পূর্ববর্তী কবিরা তাঁদের দায় ঠিকই মিটিয়ে গেছেন।

ফ্যাশন-স্টাইল, ক্ষণস্থায়ী-দীর্ঘস্থায়ী, সাম্প্রতিকতা-মহাকালের মধ্যে শব্দকুশীলবরা কী বেছে নিবেন, কোন্ গন্তব্যকে লক্ষ্য করে হবে তাদের সাহিত্য চর্চার সাধনার পথচলা, তা প্রত্যেক সাহিত্যসেবীর আগেই জেনে রাখা দরকার; কেননা টিকে থাকার জন্য এর বিকল্প কিছু নেই। ‘শিল্পের নির্মাণ ও সমীকরণ’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক স্টাইল বা স্বকীয়তার আবিষ্কার

সম্পর্কে বলেছেন, ‘প্রতিনিয়ত চিন্তার রূপ নির্মাণ, ভাবের আবহ সৃষ্টি এবং কর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে স্টাইল আবর্তিত হয়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় পরে তা এক স্বতঃস্ফূর্ত রূপ

নির্দেশ করে। যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নতুনত্বের সন্ধান চলতে থাকে এবং জীবন সৃষ্টির জন্য কাঠখড় পুড়িয়ে অনেক শিল্পী স্টাইলের স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে থাকেন।

শিল্পীর বিষয়ভিত্তিক চিন্তা থেকেই স্টাইলের আবিষ্কার’ অর্থাৎ নবীন-প্রবীণেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষাবিষয়ক সাময়িক ফ্যাশনে লিপ্ত হতেই পারেন। তবে তাঁকে এর ভেতর দিয়ে

তাঁর নিজস্ব আঙ্গিক-স্টাইলের খোঁজ পাওয়া চাই, চাই-ই। নয়তো হাজার হাজার মানুষের মতো তাঁকে বিস্মৃতির গভীরে নিয়ে যাবে মহাকালের স্রোত। ফ্যাশন হচ্ছে বাণিজ্যিকতায় পূর্ণ, যাতে ফরমায়েশ কিংবা প্রয়োজনে সাড়া দেয়ার প্রচেষ্টা থাকে। আর এ কারণেই হাল আমলের সাহিত্য সাময়িকীগুলো বেশ কিছু নিরীক্ষণে ফ্যাশনকে প্রকাশ করে থাকে। স্টাইল হলো কাল-নিরপেক্ষ ফরমায়েশবিহীন, যা সাহিত্যিকের সৃজন-ঋদ্ধতা থেকে উদ্ভূত। সৃষ্টির জন্মলগ্নে তা হয়তো ফ্যাশন থাকে কিন্তু একসময় কালজয়ী হয়ে তা হয়ে ওঠে স্টাইল। আর এ কারণেই আজো শরৎচন্দ্রের গল্প বলার ঢং কিংবা বিভূতিভূষণের চরিত্র নির্মাণের ঋদ্ধতা সর্বজন-উপাদেয় এবং আকাক্সিত। স্টাইলের প্রাপ্তিটা হলো, লেখক এখানে এসে পুরোদস্তুর থিতু হন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে থাকেন, তিনি রচনার আবেশে মুগ্ধ রাখেন পাঠককে। ফ্যাশনটা কেবলই সাহিত্যের বেলায় অস্থায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রেই অস্থায়ী। আর স্টাইলটা শুধু সাহিত্যের বেলায়ই দীর্ঘস্থায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী। ফ্যাশন কোনো শব্দসৈনিকের স্বকীয়তা বা নিজস্ব চিন্তাতেই চেতনার প্রমাণ নয়, বরং এ কথাটি স্টাইলের বেলায় যথোপযুক্ত। আবার ভিন্ন দিক বিবেচনায় ফ্যাশন হচ্ছে স্টাইলে থিতু হওয়ার প্রাথমিক ধাপ। ফ্যাশন ক্রমেই জনপ্রিয়তার পথে হেঁটে কালোত্তীর্ণ হয়ে স্টাইলে রূপ নিচ্ছে।

বিষয় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ফ্যাশনকে কেউ কেউ মুখোশ ও স্টাইলকে মুখশ্রী বলে অভিহিত করেছেন। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষের কবিতায় স্টাইল ও ফ্যাশনের

কদর বোঝাতে ‘অমিতের মুখ’ দিয়ে বলিয়েছেন- ‘ফ্যাশন হলো মুখোশ, স্টাইলটা হলো মুখশ্রী।… যারা সাহিত্য ওমরাও-দলের, যারা নিজেদের মন রেখে চলে, স্টাইলটা

তাদেরই।… বারোয়ারি তাঁবুর কানাতের নিচে ব্যবসাদার নাচওয়ালীর দর্শন মেলে, কিন্তু শুভদৃষ্টিকালে বধূর মুখ দেখার বেলায় বেনারসি ওড়নার ঘোমটা চাই। কানাত হলো

ফ্যাশনের, আর বেনারসি হলো স্টাইলের…।’ কাজেই এটা সহজেই অনুধাবনযোগ্য যে, সাহিত্য সাধনার জন্য লেখকের চিন্তা, ভাববিন্যাস, রচনার গভীরতার বিকাশ সাধনের

মাধ্যমেই স্টাইল পাকাপোক্তভাবে এসে ধরা দেয়। অর্থাৎ স্টাইলে এসে লেখক তার সত্তা, পারঙ্গমতা, আঙ্গিক, ব্যক্তিত্ব ও চিন্তার সুষ্ঠু বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ফ্যাশন ও স্টাইল সম্পর্কে উদাহরণ দেয়া যাক। কবিগুরুর রচনায় প্রকৃতি, প্রেম, জীবনদর্শন সহজ ভাষায় সরল অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠেছে। এসব লক্ষণ তাঁর প্রায় সব লেখাই লক্ষণীয়। তাঁর লেখার এমন আঙ্গিকই হচ্ছে তাঁর নিজস্ব স্টাইল। আবার সহজ বয়ান, রস-অনিবার্যতা, চমক পারঙ্গমতা- এসব হুমায়ূন আহমেদের স্টাইল। নতুনত্বের প্রত্যয়ে, নতুন ফর্ম সৃষ্টির উন্মাদনায় ফ্যাশনের পথে পথ চলা। ফ্যাশনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষেই একজন লেখক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাঁর স্টাইল খুঁজে পান। এ ক্ষেত্রে ফরাসি কবি ভের্লেনের উদাহরণ দেয়া যাক। ভের্লেন ছিলেন তৎকালীন গতানুগতিক সাহিত্যধারার বিরুদ্ধে। তিনি চেয়েছেন শক্ত ছন্দ প্রথাকে শিথিল করে সাহিত্য রচনা করতে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি লিখতে শুরু করলেন স্পন্দিত ছন্দের কবিতা। তখনকার কবিদের কাছে স্পন্দিত ছন্দে কবিতা লেখা ‘ফ্যাশন’ হিসেবে বিবেচ্য ছিল। কিন্তু ভের্লেনের উত্তরসূরি ‘র্যাঁবো’ যখন স্পন্দিত ছন্দে কবিতা লিখতে শুরু করলেন এবং এতে র্যাঁবো সফলতারও পরিচয় দিলেন, তখন এ ধারাটি আর ফ্যাশন থাকল না। জনপ্রিয়তা পেয়ে স্টাইলে রূপলাভ করল। আবার র্যাঁবোর গদ্য কবিতা ছিল তৎকালে ফ্যাশন। পরে তাঁর এই গদ্য আঙ্গিকের কবিতা সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পায় এবং এ ধারা এখন পর্যন্ত সগৌরবে টিকে আছে। গদ্য কবিতা এখন স্টাইলে পরিগণিত হয়েছে। ভের্লেন তাঁর স্পন্দিত ছন্দ এবং র্যাঁবো তাঁর গদ্য কবিতার স্টাইলের জন্য আজো বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। বাংলাদেশের চিরায়ত গ্রামবাংলার রূপ-বৈচিত্র্য, সমাজচিত্র খুব প্রকটভাবে স্থান পেয়েছে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের লেখায়। রবীন্দ্র-নজরুলের বলয়ের বাইরে তিনি নতুন ধারায় লিখতে শুরু করেছিলেন। জসীমউদ্দীন তাঁর স্বকীয়তা বা নিজের চিন্তায় জানান দিয়েছিলেন তাঁর স্টাইলের কথা। আবার নোবেল বিজয়ী আইরিশ কবি সিমাস হিনি ছিলেন গীতি কবিতার জন্য বিখ্যাত। তিনি যখন গীতি কবিতা ছেড়ে ফ্রি ভার্সেই কিছু কবিতা লিখলেন, তখন সেটা হলো তাঁর ফ্যাশন। বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রথম প্রথম সব দশকের লেখকেরাই নতুন ধারায় লিখতে শুরু করেছিলেন এবং সে ধারা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়েছে। সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্য। তাই যারাই লিখছেন, লিখতে চেষ্টা করছেন তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত লেখার নিজস্ব স্টাইল খুঁজে পাওয়া।

 

সাহিত্য বিস্তারে এবং সাহিত্য সম্ভারকে সমৃদ্ধ করতে ফ্যাশন অবশ্যই গুরুত্বের দাবি রাখে, তবে স্টাইলের গুরুত্ব তার চেয়ে ঢের বেশি। এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে ফ্যাশন না থাকলে নতুন ফর্মের, নতুন ধারার সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হতো না, আমরা পড়ে থাকতাম সেই চর্যাপদের যুগে। ফ্যাশনের ধর্মই নিরীক্ষণ, আবিষ্কার। ফ্যাশনের মধ্য দিয়ে লেখক তার স্বকীয়তার সন্ধান করে ফেরেন। কিন্তু ফ্যাশনের মাধ্যমে নিজের চিন্তাচেতনা উৎকৃষ্ট পর্যায়ে উৎসারিত না হলে, স্টাইল রপ্ত করতে না পারলে লেখকের সাহিত্য জগতে স্থান হবে অনাহূতের মতো, নির্জীব। তাই শব্দসৈনিকের মূল লক্ষ্যই থাকবে দূর-দূরান্তে, কালের সীমানা ছাড়িয়ে- স্টাইলে, ফ্যাশনে নয়। তাঁদের নিজস্ব চিন্তাচেতনা, উপলব্ধি, বিকাশ ও মননে শাণিত হবে আমাদের সাহিত্য- এমনটাই থাকবে প্রত্যাশা।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *