প্রধান দু‘দলের নির্বাচনী ইশতেহার: শিক্ষা, চিকিৎসা, হাউজিং প্রাধান্য

যুক্তরাজ্য

আবদুল কাইয়ূম

লেবার ইশতেহার

250px-Logo_Labour_Party.svg* জিরো আওয়ার চুক্তি বাতিল * ন্যুনতম মজুরি ৮ পাউন্ডেন উন্নীতকরন *টিউশন ফি ৬ হাজার পাউন্ডে নামিয়ে আনা  *এনার্জি বিল ফ্রিজ  *রেল ভাড়া ১ বছর ফ্রিজ * ১শ হাজারের জন্য ৫০ পেন্স ট্যাক্স * ২শ হাজার নতুন বাড়ি * ৮টা থেকে ৬টা পর্যন্ত চাইল্ড কেয়ারের নিশ্চয়তা

কনজারভেটিভ ইশতেহার

download* ২০১৭ সালের মধ্যে ইইউ প্রশ্নে রেফারেন্ডাম * ২শ হাজার নতুন বাড়ি *টেনেন্টদের জন্য রাইট টু বাই * আরো ৫শ ফ্রি স্কুল *এনএইচএস’র জন্য ৮ বিলিয়ন *১২ হাজার ৫শ পাউন্ডের নিচে ইনকাম ট্যাক্স মওকূফ *চাইল্ড বেনিফিট বৃদ্ধি *পার্লামেন্টের সিট ৬শ’তে নামিয়ে আনা

2701153820_d8a1197bed_oলন্ডন, ১৬ এপ্রিল – ৩০ মার্চ পার্লামেন্ট বিলুপ্তি ঘোষণার পর বলা যায় জনশূন্য হয়ে আছে ৬৫০ আসনের হাউজ অব কমন্স। কিছু দিনের মধ্যে তা আবার মুখর হয়ে উঠবে। আগামী ৭ মের নির্বাচনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সবুজ আসনগুলোকে অলংকৃত করবেন এর নির্বাচিতরা। প্রথানুযায়ী যারা সরকার গঠন করবেন তাদের স্থান হবে স্পিকারের ডানে আর যারা বিরোধী দলে থাকবেন তাদের স্থান বামে। ব্যক্তিগতভাবে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির স্থান যেখানেই হোক দলীয় ভিত্তিতে অবস্থান কোন পাশে হবে সেই যুদ্ধ এখন তুঙ্গে। তƒলনামূলক কম আলোচিত দলগুলো তাদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি বা বর্তমান জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করলেও প্রধান দ্দুল তথা লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টি নেতৃত্ব পেতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এরই মধ্যে প্রায় সব গুলো দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। তবে প্রধান দুই দল লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির ইশতেহারের দিকেই সতর্ক দৃষ্টি সচেতন জনসাধারণের। বার্মিংহামে লেবার পার্টির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার পরদিন ১৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার সুইনডনে কনজারভেটিভ পার্টি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। ঘোষিত ইশতেহারে শিক্ষা, চিকিৎসা ও হাউজিংকেই প্রায় সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছে দল দু-টি। সভা-সমাবেশে ইমিগ্রান্ট সমস্যা নিয়ে উত্তাপ ছড়ালেও সার্বিক অর্থে ইশতেহারে অর্থনৈতিক প্রবৃত্তি অর্জনকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দ্ুিট বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রায় ৭০টি করে সুনির্দিষ্ট পয়েন্টভিত্তিক প্রস্তাবনা পেশ করে। এর মধ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও হাউজিং এর মতো মৌলিক বিষয়কগুলোতে প্রায় কাছাকাছি প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে। গত পার্লামেন্টে মোট ১৩টি দলের প্রতিনিধিত্ব ছিলো। এবার এর সংখ্যা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাড়ছে ছোট দল গুলোর সিট বাড়ার সম্ভাবনা। এদিক থেকে আলোচনায় রয়েছে ইউকিপ ও এসএনপি। লিবডেমের অবস্থা নাজুক হলেও শেষ মূহুর্তে দলের প্রধান নিক ক্লেগ তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিভিন্ন পোলের জরিপে প্রধান দ্ুিট দলের অবস্থান প্রায় সমানে সমান হলেও বিপুলসংখ্যক ভোটার এখনো আনডিসাইডেট বা সিদ্ধান্তহীন রয়ে গেছেন। এসব আনডিসাইডেট ভোটারদের কথা মাথায় রেখে প্রত্যেক দলই আশায় বুক বেধে আছে। তাদের মতামত যেদিকে প্রতিফলিত হবে তারাই বৃটেনের নেতৃত্বের আসনে বসবেন। আর বিশ্লেষকদের ধারণা এসব আনডিসাইডেট ভোটাররাই হবেন বৃটেনের আগামীর নির্মাতা।

গত ১৩ এপ্রিল, সোমবার, লেবার পার্টি লিডার এড মিলিব্যান্ড দলের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে বলেছেন, ওয়ার্কিং ফেমেলির সফলতায়ই বৃটেনের সফলতা। পার্টির পক্ষে আরো বলা হয়, কোনো ধরনের ঋণ গ্রহণ ছাড়াই পার্টির প্রতিশ্রুত পলিসি বাস্তবায়নের জন্য ফান্ডের ব্যবস্থা করা হবে। এতে আরো প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলা হয় যে, আগামীতে লেবার সরকার গঠন করলে প্রথম বাজেটেই ডেফিসিট কাট বা ঘাটতি কমানোর অঙ্গীকার থাকবে। ক্যামেরন সরকারের ধনীবান্ধব নীতির কড়া সমালোচনা করে লেবার নেতা বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে লেবার সরকার মুষ্টিমেয় ধনীদের জন্য নয় বরং সংখ্যাগরিষ্ট সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সামনে রেখে কাজ করবে। লেবারের নির্বাচনী ইশতেহারে ন্যূনতম মজুরী ঘন্টায় ৮ পাউন্ডে উন্নীত করা, দেশটির ক্ষƒদন্দ ও মাঝারিব্যবসা গুলোর বিজনেস রেইট কমানো এবং শিশু ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

করের হার, ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স এবং ভিএটি (মূল্য সংযোজন কর) বাড়বে না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। সেইসাথে আছে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্যাস এবং বিদ্যুত বিল না বাড়ানোর ওয়াদা। এর বিপরীতে রয়েছে, নন ডোম আইন বতিল (এই আইনের ফলে ব্যবসায়ীরা অন্যদেশে থাকা ব্যবসার জন্য কর দেয় না), হেজ ফান্ডের কর নিশ্চিত করা এবং কর ফাঁকি রোধ করার মাধ্যমে বছরে সাড়ে সাত বিলিয়ন পাউন্ড তহবিল বৃদ্ধি। যারা বছরে এক লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডে বেশি আয় করেন তাদের করের হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করবে মিলিব্যান্ডের সরকার।

টোরি সরকারের চালু করা বিতর্কিত জিরো আওয়ার চুক্তি বাতিল করার পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি শিক্ষা ফি বছরে ৯ হজার পাউন্ড থেকে কমিয়ে ৬ হাজার পাউন্ড করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) সম্পর্কে দলটির প্রতিশ্রুতি হলো, ক্যামেরন সরকার জাতীয় স্বাস্থ্যসেবাকে বেসরকারী করনের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে তার থেকে রক্ষা করে এনএইচএস্কে তার মৌলিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।

টোরিদের ব্যয় সংকোচন নীতি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি মোকাবেলার জন্য সাধারণ মানুষের কল্যাণ ব্যয় কর্তন নয়, প্রয়োজন কর ফাঁকিবাজদের দমন করা এবং রাষ্ট্রের প্রতি ধনিদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা। এ জন্য দলটি ২০ হাজার নার্স, আট হাজার চিকিৎসক, তিন হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ করবে। যার জন্য ব্যয় হবে প্রায় দুই দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড দুই মিলিয়ন অধিক মূল্যের বাড়ির ওপর ম্যানশন ট্যাক্স চালু করে তারা ওই অর্থের যোগান দেবে।

এড মিলিব্যান্ড অভিযোগ করেন, কনজারভেটিভ দল এনএইচএস-এ আট বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই অর্থ কোথা থেকে আসবে সে বিষয়ে তাদের কোনো ব্যাখ্যা নেই। কনজারভেটিভ দলের প্রতিশ্রুতিগুলো অবাস্তব এবং বিশল্গাযোগ্য নয় দাবি করে মিলিব্য্রা বলেন, তারা প্রতিশ্রুতি পূরণে একটাই পথ জানে আর তা হলো গরীব মানুষের বেনিফিট কর্তন করা।

এদিকে, লেবার পার্টির ইশতেহার ঘোষণার ঠিক পরেরদিন ১৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার সুইনডেনে এক সমাবেশে কনজারভেটিভ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। কনজারভোটিভ পার্টির ম্যানিফেস্টুর প্রধান বার্তা হলো শক্তিশালী নেতৃত্ব, পরিষ্কার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং তুলনামূলক উজ্জ্বল, নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ। কনজারভেটিভ নেতা, প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করে বলেন, আমি বৃটেনের জনগণকে ভালো জীবন উপহার দিতে চাই। তিনি আরো বলেন, ২০১০ সালে তারা যখন ক্ষমতায় আসেন তখন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছিলেন। আবার সরকার পরিচালানার দায়িত্ব নিয়ে সেই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বৃটেনকে উদ্ধারের মাধ্যমে তার অসমাপ্ত কাজের সমাপ্তি টানতে চান তিনি। ক্যামেরন তার বক্তব্যে কনজারভেটিভ পার্টিকে শ্রমজীবী মানুষের দল বলেও আখ্যায়িত করেন।

কনজারভেটিভ পার্টির ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য দিক হলো টেন্যান্টদের জন্য রাইট টু বাই এর সুযোগ রেখে নিউ বাইয়াদের জন্য ২শ বাড়ি নির্মাণের ঘোষণা। ন্যুনতম যারা ৩০ ঘন্টা কাজ করবেন তাদের ইনকাম টেক্স না দেওয়ার নিশ্চয়তা। ২০১৭ সালের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রের সম্পদের টেক্স ১ মিলিয়নে উন্নীত করা হবে। ২০২০ সাল পর্যন্ত রেলের ভাড়ায় কোনো মুদ্রাস্ফীতি নয়। ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৮ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্ধ দেয়া হবে। শিক্ষাক্ষেত্রের ব্যর্থতা ঘোচাতে ৫ শতাধিক ফ্রি স্কুল খোলা এবং ২০১৭ সালের মধ্যে ইইউ বিষয়ে রেফারেন্ডাম আয়োজনের ঘোষণা রয়েছে কনজারভোটিভের ইশতেহারে।

কনজারভেটিভ চ্যান্সেলের জর্জ ওসবর্ন লেবার লিডারের সমালোচনা করে বলেছেন, এড মিলিব্যান্ড অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, লেবারের স্মল প্রিন্ট পড়লে তাতে বৃটেনের জন্য কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে না। বৃটেনবাসী অতীতের মতো আর অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলায় ফিরে যেতে চায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *